আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে নাড়া দিয়েছেন লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজ এক খোলা চিঠিতে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে বিদায় বলে দেন কিংবদন্তি এই ফুটবলার। ইতি ঘটল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের দুই দশকের মহাকাব্যিক পথচলা।
স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের ঠিক দুই দিন পরেই চিঠিটি লিখেছিলেন মেসি। তবে চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাবার মৃত্যুর পরই কেবল তিনি নিজের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পেরেছেন।
সর্বকালের সেরা এই ফুটবলার বিদায় জানালেন সেই জাতীয় দলকে, যাকে তিনি বড্ড ভালোবেসেছিলেন, যার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন এবং যার হাত ধরেই পৌঁছেছিলেন ক্রীড়া জগতের সর্বোচ্চ শিখরে। কোটি কোটি মানুষের বুক আজ ব্যথায় ভারাক্রান্ত, কৃতজ্ঞতায় ভরে থাকা সেই মনগুলো এখন এক শূন্যতা অনুভব করছে। নিজের ঘোষণায় চিরস্মরণীয় সেই ১০ নম্বর জার্সির মালিক যথাযথভাবেই লিখেছেন—‘আমি শূন্য হয়ে গেছি।’
স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচের ঠিক দুই দিন পর, গত ২১ জুলাই চিঠিটি লিখেছিলেন মেসি। পরে তা সবার সামনে প্রকাশ করা হলেও, বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি (পরবর্তীতে মারা যান) এবং নানা কারণে এটি প্রকাশ করতে কিছুটা দেরি হয়।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ২০৭টি ম্যাচ, ১২৫টি গোল এবং ৬৭টি অ্যাসিস্ট—এটাই ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির অমর কীর্তি। ঝুলিতে আছে দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপার গৌরব। ফিনালিসিমার সেই জাদুকরী মুহূর্তগুলো ছিল ফুটবলের অমৃত সুধা। কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর সেই সব ম্যাচ আর গোলগুলো তাকে এনে দিয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা, যা ছিল নিখাদ এক জয়োৎসব।
২০০৫ সালের আগস্টে জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির অভিষেক হয়েছিল এবং শুরুতেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে—এক অদ্ভুত ও চরম নাটকীয় পরিস্থিতি, যা যেন এক অর্থে তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারেরই পূর্বাভাস ছিল। কারণ, ক্লাব ফুটবলে মেসি হয়ে উঠেছিলেন বার্সেলোনার মেসি; কিন্তু আলবিসেলেস্তেদের আকাশী-সাদা জার্সি গায়ে জড়িয়েই তিনি সবকিছু সহ্য করেছেন, আর এই রঙই তার কিংবদন্তি তকমাকে চিরস্থায়ী করেছে।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে লিওনেল মেসির অবসরের সেই চিঠি
ফাইনালের পর থেকে এতগুলো দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর এবং অনেক ভেবেচিন্তে, আমি সবাইকে জানাতে চাই যে আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…
সিদ্ধান্তটি তখনো যেমন কষ্ট দিয়েছিল, আজও ভীষণ ব্যথা দেয়; তবে আমি বুঝতে পেরেছি যে এটাই সঠিক সময়। আমি শপথ করে বলছি, আমি সবসময় আমার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি—শুধু গত কয়েক বছর নয়, যখন আমরা সবকিছু জিতেছিল, তার আগেও। এই জার্সির জন্য আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং সবটুকু দিয়েছি, যাতে ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের মনে আনন্দ এনে দিতে পারি এবং একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে আপনাদের বুক ফুলিয়ে গর্ব করার সুযোগ করে দিতে পারি।
সময় ফুরিয়ে আসছে, জীবনের একেকটি অধ্যায় শেষ হচ্ছে—আর এটি এমন এক অধ্যায় যা মেনে নেওয়া বড্ড কঠিন। আমি জাতীয় দলে খেলাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি এবং চিরকাল ভালোবেসে যাবো। আমি আমার সবকিছু দিয়ে দিয়েছি; দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তাছাড়া, আমার পরে এমন কিছু দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যাদের সেখানে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
গত ২০ বছর ধরে আপনারা যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে আপনাদের সবার গলা ফাটানোর আওয়াজটা আমার ভীষণ মনে পড়বে। এখন থেকে আমি আপনাদেরই একজন হয়ে বাইরে থেকে (সুসময়ে ও দুর্সময়ে, আরও জোরালোভাবে) হাততালি দেবো এবং সমর্থন জুগিয়ে যাবো।
আমার পরিবারকে ধন্যবাদ, যারা সবসময় আমার পাশে থেকেছে এবং এই সুন্দর অথচ কঠিন পথ চলায় আমার সঙ্গী হয়েছে। যেসব কোচ, সতীর্থ এবং ম্যানেজারের সাথে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি সব অবিস্মরণীয় স্মৃতি আর মুহূর্ত।
আমার সতীর্থদের সাথে নিয়ে আপনাদের কিছু স্বপ্নীল মুহূর্ত উপহার দিতে পারার শান্তি ও গর্ব বুক নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের সাথে এই পুরো যাত্রাপথটা অনুভব করা ছিল অবিশ্বাস্য। আপনাদের সবাইকে অনেক ভালোবাসি!
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ার জন্য।
এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা!
