ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » অস্তিত্ব সংকটে জুলাই আন্দোলনের ‘ঢাল’ হয়ে থাকা নারী মুখগুলো

অস্তিত্ব সংকটে জুলাই আন্দোলনের ‘ঢাল’ হয়ে থাকা নারী মুখগুলো

জহিরুল ইসলাম রাতুল: ২০২৪ সালের জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন তখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বৃহত্তর গণআন্দোলনে। রাজপথে পুলিশের বাধা, হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে সামনে দাঁড়াচ্ছেন তরুণীরা। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন, কেউ মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কেউ আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ আবার খাবার, পানি ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে আন্দোলনের সমন্বয়েও ভূমিকা রাখছেন অনেকে।

কখনো পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছেন তারা, কখনো সহপাঠীদের রক্ষা করতে নিজেরাই হয়ে উঠেছেন ‘মানবঢাল’। মিছিলের সামনে নারীদের উপস্থিতি শুধু আন্দোলনের শক্তি বাড়ায়নি, বরং সাধারণ পরিবারগুলোকেও রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মানসিক সাহস জুগিয়েছে।

কিন্তু যে নারীরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কঠিন সময়ে রাজপথে দৃশ্যমান ছিলেন, অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় তাদের অনেককেই আর সেইভাবে দেখা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার, সংস্কার প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন কিংবা জাতীয় নির্বাচনে—নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় কমই ছিল। ফলে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জুলাইয়ের সেই সাহসী নারী মুখগুলো কোথায় গেলেন? কেন আন্দোলনের সময় তাদের প্রয়োজন হলো, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় তাদের উপস্থিতি এতটা সীমিত হয়ে পড়ল?

নারী অধিকারকর্মী, আন্দোলনের নেত্রী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর পেছনে শুধু নারীদের রাজনৈতিক অনাগ্রহ নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামোর পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র, সাংগঠনিক প্রস্তুতির ঘাটতি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা, সাইবার হয়রানি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা—সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা কাজ করছে।

রাজপথে নারীরাই ছিলেন দৃশ্যমান

জুলাই আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারী অধিকারকর্মী শিরীন পারভিন হক।

তার মতে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীদের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসার ঘটনা ছিল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্ত। এরপর ইডেন কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন বয়সী মায়েদের অংশগ্রহণও আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। তারা পানি ও খাবার নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। ফলে আন্দোলন ধীরে ধীরে শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে পরিণত হয়।

শিরীন পারভিন হকের ভাষায়, নারীদের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছিল।

‘ঢাল’ হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন নারীরা

আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত নারী মুখ ও এনসিপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীরা কেবল মিছিলের অংশ ছিলেন না; তারা চিকিৎসা, খাবার, আশ্রয় ও আহতদের সহায়তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তার ভাষায়, অনেক পরিস্থিতিতে নারীরা ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের আক্রমণের সময় মেয়েরা মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে সহপাঠীদের রক্ষা করেছেন।

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ছেলেদের হলগুলোতে তালা দেওয়ার পর কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ছাড়াই মেয়েদের বেরিয়ে এসে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

অর্থাৎ আন্দোলনের প্রয়োজনে নারীরা তখন নেতৃত্ব, সংগঠন ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মুখসারিতে ছিলেন।

‘আন্দোলন তখনই জনগণের আন্দোলনে পরিণত হয়’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়েই নারীরা সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

তার মতে, একটি আন্দোলনের অনেকগুলো দিক থাকে। রাজপথের মিছিল থেকে শুরু করে সংগঠন, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও সহায়তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীদের ভূমিকা ছিল।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক নাফসিন মেহনাজ আজিরিন বলেন, নারীরা যখন রাজপথে নামেন, তখন আন্দোলনটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়।

তার মতে, নারীদের উপস্থিতি সাধারণ পরিবারগুলোর মধ্যে আন্দোলনের প্রতি আস্থা তৈরি করেছিল এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে নারীরা আন্দোলনকে গণসম্পৃক্ত করে তুলতে এত বড় ভূমিকা রাখলেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় তারা কেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলেন?

অভ্যুত্থানের পরেই দৃশ্যপট বদলে যায়

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু শুরু থেকেই নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

শিরীন পারভিন হকের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় নারী অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। উপদেষ্টা পরিষদে নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যেও কোনো নারীকে রাখা হয়নি।

এরপর আসে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরে ডিসেম্বরে নারী সংস্কার কমিশনসহ আরও পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়।

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, নারী সংস্কার কমিশন বাদে অন্য ১০টি সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সদস্য মিলিয়ে মোট ৯৭ জনের মধ্যে নারী ছিলেন ১৫ জন। কোনো কমিশনের প্রধানই ছিলেন না নারী।

অন্যদিকে নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সদস্য মিলিয়ে ছিলেন ১০ জন এবং তারা সবাই নারী।

এখানেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে একটি বৈপরীত্য—রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেখানে নারীদের নিয়ে আলাদা কমিশন থাকলেও বৃহত্তর সংস্কার কাঠামোয় তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত।

নারী সংস্কার কমিশনও কি ছিল বিচ্ছিন্ন?

শিরীন পারভিন হকের বক্তব্য অনুযায়ী, নারী সংস্কার কমিশন গঠনের পর তারা অন্যান্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন। অধিকাংশ কমিশন ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।

তার দাবি, সংবিধান সংস্কার কমিশন জানিয়েছিল তাদের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় আলাদা করে বসার প্রয়োজন নেই।

পরবর্তীতে গঠিত ঐকমত্য কমিশনেও নারী সংস্কার কমিশনসহ দ্বিতীয় পর্যায়ে গঠিত পাঁচটি কমিশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এতে প্রশ্ন ওঠে—নারী বিষয়ক সংস্কারকে কি রাষ্ট্র সংস্কারের মূলধারার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল, নাকি আলাদা একটি বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল?

৪২০ সুপারিশ থেকে ৫১—কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা?

নারী সংস্কার কমিশন মোট ৪২০টি সুপারিশ করেছিল বলে জানান শিরীন পারভিন হক। এর মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ৫১টি সুপারিশের একটি তালিকাও তৈরি করেছে কমিশন।

তার ভাষ্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব সুপারিশের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

তিনি বলেন, সব পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে যেসব সুপারিশ তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো দিয়ে শুরু করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

জুলাই সনদেও কি পুরুষ আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি?

শিরীন পারভিন হকের মতে, জুলাই সনদ ঘোষণার সময়ও নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তার মন্তব্য, “জুলাই সনদ ঘোষণার দিন পরিষ্কার হয়ে গেল যে আমরা আবার পুরুষ আধিপত্যকেই প্রতিষ্ঠা করলাম।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত যে প্রশ্নটি সামনে আনছেন তা হলো—জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কি শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার কাঠামোও বদলে দেওয়ার সুযোগ ছিল?

যদি দ্বিতীয়টি লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে নারীদের অবস্থান কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাজপথের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্তের টেবিলে অনুপস্থিতি

নাফসিন মেহনাজ আজিরিনের ভাষায়, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক নারীকে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আর দেখা যায়নি।

তার মতে, সমস্যাটি নারীদের যোগ্যতার নয়; সমস্যাটি ক্ষমতার কাঠামোর।

“এই কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে নারীদের প্রবেশ ও টিকে থাকা—দুটোই কঠিন,”—তার বক্তব্য।

অর্থাৎ আন্দোলনের সময় যে নেতৃত্বের দক্ষতা প্রয়োজন হয়েছিল, তা নারীরা দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তি, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা তাদের অনেকেরই ছিল না।

আন্দোলন আর সংগঠিত রাজনীতি এক নয়

নুসরাত তাবাসসুমের মতে, জুলাই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ পরবর্তীতে সব ক্ষেত্রে সংগঠিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণে রূপ নেয়নি।

তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া আর সংগঠিত রাজনীতিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকা এক বিষয় নয়।

বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর সমস্যার পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ জুলাইয়ের রাজপথ নারীদের জন্য একটি অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করলেও, সেই অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি দরকার ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল।

দলীয় রাজনীতির দরজা কতটা খোলা?

নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা।

জুলাই সনদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ৩০০ আসনের মধ্যে ন্যূনতম ৫ শতাংশে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলই সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি।

পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথা রয়েছে।

কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশের ন্যূনতম লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, তারা ভবিষ্যতে ১০ শতাংশে পৌঁছাতে কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেবে—তা নিয়েই তৈরি হয়েছে সংশয়।

উমামা ফাতেমার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নারী অংশগ্রহণের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম।

তার অভিযোগ, যোগ্য নারী নেত্রীদের সরাসরি নির্বাচনে না এনে সংরক্ষিত আসনে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তার মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করে নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রার্থী দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। এ নিয়ম না মানলে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থারও প্রস্তাব দেন তিনি।

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থারও পক্ষে তিনি।

নিরাপত্তাহীনতা—রাজনীতি থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার অদৃশ্য অস্ত্র

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি নিরাপত্তাহীনতা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আলোচনায় আসা ১৫ নারীকে নিয়ে করা ১৩৯টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, ৮৮টি পোস্টে—অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ পোস্টে—যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি, অবমাননাকর ভাষা বা নারীর চরিত্র নিয়ে আক্রমণ করা হয়েছিল।

এরপর সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বডি-শেমিং। অন্তত ২২টি পোস্টে এ ধরনের আক্রমণের কথা উঠে আসে।

এ ধরনের আক্রমণের উদ্দেশ্য শুধু একজন নারীকে অপমান করা নয়; বরং তার রাজনৈতিক বৈধতা, ব্যক্তিগত চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাকে জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া।

পুরুষ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতবিরোধ অনেক সময় রাজনৈতিক যুক্তি বা আদর্শের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু নারী রাজনীতিকের ক্ষেত্রে সেই আক্রমণ দ্রুত ব্যক্তিগত জীবনে চলে যায়—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাফসিন মেহনাজ বলেন, নারীর পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার—সবকিছুই আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে একজন নারীকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না; একই সঙ্গে তাকে সামাজিক বিচার, অনলাইন হয়রানি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের সঙ্গেও লড়তে হয়।

আক্রমণ শুধু একজনকে নয়, পরিবারকেও আঘাত করে

শিরীন পারভিন হকের মতে, সাইবার স্পেসে নারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারও এর শিকার হয়।

এই বাস্তবতায় একজন নারী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার আগে নিজের নিরাপত্তা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু বিবেচনা করতে বাধ্য হন।

নুসরাত তাবাসসুমের ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়।

তার মতে, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে যেখানে নারীরা অনেক সময় নিজেদের ঘরেও নিরাপদ বোধ করেন না।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাবও বড় বাধা

রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য শুধু জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক দক্ষতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

সভা-সমাবেশ, সংগঠন পরিচালনা, প্রচারণা, কর্মী সংগঠিত করা—সবকিছুর সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু অনেক নারী আয় করলেও সেই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা পান না বলে মনে করেন নুসরাত তাবাসসুম।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বৈষম্যও দীর্ঘমেয়াদে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে প্রভাবিত করে।

এমনকি উচ্চশিক্ষায় যাতায়াত ও আবাসনের সুযোগের বৈষম্যও নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আবাসিক হলের সংখ্যা কম থাকার উদাহরণ দিয়ে তিনি এটিকে একটি কাঠামোগত বৈষম্য হিসেবে দেখেন।

অর্থাৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকটটি শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। এটি শিক্ষা, আবাসন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

‘সংকটে নারী, রাষ্ট্র গঠনে নয়’—এই সংস্কৃতি কি বদলাবে?

জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সংকটের মুহূর্তে নারীরা সামনে আসতে পারেন। ঝুঁকি নিতে পারেন। নেতৃত্ব দিতে পারেন। সংগঠিত করতে পারেন।

কিন্তু সংকট শেষ হওয়ার পর সেই নেতৃত্বকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কাঠামোয় কতটা জায়গা দেওয়া হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

নাফসিন মেহনাজ আজিরিনের প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ—নারীদের কি শুধু সংকটের সময় প্রয়োজন, নাকি রাষ্ট্র গঠনেও তাদের সমান অংশীদার হিসেবে দেখা হবে?

তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ছিলেন না; তারা ছিলেন আন্দোলনের চালিকাশক্তির অংশ। কিন্তু সংকট শেষ হওয়ার পর তাদের অনেককে ‘প্রতীকী’ উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

তার বক্তব্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারী নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

কীভাবে বদলানো যেতে পারে পরিস্থিতি?

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য শুধু সংরক্ষিত আসন বা কোটা যথেষ্ট নয়—এমন মতও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

উমামা ফাতেমা চান, নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা হোক এবং তা না মানলে দলগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থার পক্ষেও মত দেন।

নুসরাত তাবাসসুমের মতে, কোটা বা প্রণোদনার পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ ও সমান সুযোগের পরিবেশ। বদলাতে হবে সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতা।

আর শিরীন পারভিন হক মনে করেন, নারীর উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তার মতে, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে পেছনে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য নারীদের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, ন্যায্যতা ও সমতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজপথের শক্তিকে রাষ্ট্রে নেওয়া না গেলে অপূর্ণ থাকবে জুলাইয়ের শিক্ষা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় শিক্ষা ছিল—নারীরা শুধু দর্শক নন। তারা চাইলে আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারেন এবং প্রয়োজনে নেতৃত্বের ভারও নিতে পারেন।

কিন্তু সেই শক্তি যদি আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের একটি বড় সম্ভাবনাই অপূর্ণ থেকে যায়।

আজকের বাস্তবতা হলো, জুলাইয়ের রাজপথে যে নারীরা পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, আহতদের হাসপাতালে নিয়েছিলেন, খাবার-পানি পৌঁছে দিয়েছিলেন, সহপাঠীদের নিরাপত্তায় নিজেরা সামনে এসেছিলেন—তাদের অনেকেই পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্র থেকে দূরে।

এটি কেবল নারীর প্রতিনিধিত্বের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তিরও সংকট।

কারণ কোনো গণঅভ্যুত্থান তখনই পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ নেয়, যখন আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনগোষ্ঠীগুলো পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পায়।

জুলাইয়ে নারীরা রাজপথে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি সেই সক্ষমতার স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত?

নারীরা কি কেবল আন্দোলনের ‘ঢাল’ হয়ে থাকবেন, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেও সমান অংশীদার হবেন—বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে সেটিই।

শিরীন পারভিন হকের ভাষায়, পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। কিন্তু শুরুটা করা সম্ভব। তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, আর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কাজও এখনই শুরু করতে হবে।

কারণ জুলাইয়ের রাজপথে নারীরা যে সাহস, নেতৃত্ব ও সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, সেটিকে যদি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কাঠামোয় জায়গা দেওয়া না হয়, তাহলে সেই সাহস শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে—রাষ্ট্র পরিবর্তনের স্থায়ী শক্তি হয়ে উঠবে না।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে