নবপ্রকাশ ডেস্ক:
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যকার রক্তাক্ত সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। এর জের ধরে সৌদি আরবের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুতি বিদ্রোহীদের চালানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মোট তিনজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতিদের ৮০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় স্মরণকালের অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজধানী রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আবহা বিমানবন্দরে মঙ্গলবার ও বুধবার এই হামলাগুলো চালানো হয়। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন নিহত ও ৮ জন আহত হন। অন্যদিকে আবহা বিমানবন্দরের স্থাপনায় হামলায় দুজন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে হুতি বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করে ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও পৃথক হামলা চালায়। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কায়রো থেকে একটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট অবতরণের কয়েক মিনিট আগে এডেন বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হয়। এ ছাড়া রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি জোট।
হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানান, বেশ কয়েকটি চালকহীন বোমারু ড্রোন দিয়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে সফল হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে এই নজিরবিহীন হামলার পরপরই গভীর রাতে কঠোর জবাব দেওয়া শুরু করেছে সৌদি-নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট। জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইয়েমেনের সা’দা, হোদেইদাহ, জাওফ ও মারিব অঞ্চলে হুতিদের ৮০টিরও বেশি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রাগার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্যাড লক্ষ্য করে ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধানতম রুট ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালী। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দাব এখন বৈশ্বিক তেল পরিবহনের একমাত্র বিকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ পথ। চলতি সপ্তাহে সৌদি জোটের বিমান সহায়তায় ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের দখল থেকে বাব আল-মান্দাব ও কৌশলগত মোচা শহরের আশপাশের এলাকা পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার রেশ হিসেবে তৈরি হওয়া ইয়েমেনের এই সাম্প্রতিক রণাঙ্গন দেশটিতে দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বুধবার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই লড়াই শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চরম খাদ্য সংকটে থাকা দেশটিতে প্রতি ৪টি পরিবারের ৩টিই অনাহারের মুখে রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং হুতি প্রতিরোধ জোরদার করতে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক প্রতিরক্ষামূলক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। অপরদিকে, মিত্র দেশ সৌদি আরবের সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা কিংবা প্রয়োজনে সেনাদল মোতায়েনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সিরিয়া সরকার। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে এই আঞ্চলিক সামরিক রক্তক্ষয় পুরো বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে মারাত্মক ধসের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
