ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » ববি হাজ্জাজের মন্তব্যের পর বুয়েটের ছাত্র রিফাতের পোস্ট

ববি হাজ্জাজের মন্তব্যের পর বুয়েটের ছাত্র রিফাতের পোস্ট

নবপ্রকাশ ডেস্কঃ
ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে নিয়ে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় একটি মতামত দিয়েছেন। তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। এ নিয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। তবে শুরুতেই বলে নেই, আমি ঢাবি থেকে বিএসসি করিনি। ঢাবির IBA থেকে MBA করেছি, সেই সূত্রে এই গ্রুপে প্রবেশ। আমার বিএসসি ছিল বুয়েট থেকে।
কাজের কথায় আসি। আমি বুয়েটে পড়লেও স্টুডেন্ট লাইফে বেশিরভাগ সময়েই ঢাকা ভার্সিটির শহীদুল্লাহ হলে পড়ে থাকতাম। আমার খুব কাছের একজন বন্ধু ছিল শহীদুল্লাহ হলে, পড়ত মাইক্রোবায়োলজিতে। সেই বন্ধু এখন আমেরিকার John Hopkins University তে পিএইচডি করছে।
বন্ধু থাকত শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে খাবারের দোকানগুলোর পাশে যে বিল্ডিং আছে (বিল্ডিং এর নাম মনে নেই) সেই বিল্ডিং এর পাঁচতলায়। ছোট একটা অন্ধকার রুমে পাঁচটা বেডে দশজন থাকত (ডাবলিং করে)। আমি যতবারই ওর রুমে যেতাম ততবারই ভাবতাম, মানুষগুলো এই পরিবেশে কীভাবে থাকে? নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, আলো বাতাস নেই এমন একটা রুম। তার ওপর আবার দশজন। সেই তুলনায় বুয়েটের সোহরাওয়ার্দী হলের আমার রুমটাকে মনে হতো স্বর্গ। একটা বিশাল খোলামেলা রুমে আমরা মাত্র দুজন থাকতাম। দুইদিকেই বারান্দা ছিল।
আশ্চর্য ব্যাপার হলো, শহীদুল্লাহ হলের এই জঘন্য রুমে থেকেই আমার বন্ধু ঠিক প্রতিবছর ভালো রেজাল্ট করত। মোটামুটি থার্ড ইয়ার থেকে ক্যাম্পাসে গেলেই তাকে আমি আর পেতাম না। ফোন দিলেই শুনতাম সে ল্যাবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ল্যাবে কী এত কাজ করে আমি বুঝতাম না। শুধু সে না, ততদিনে তাদের ডিপার্টমেন্টের অনেকের সাথেই আমার ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। আমি দেখতাম অনেকেই সারাদিন ল্যাবে পড়ে থাকে। বন্ধুর একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল, একই ডিপার্টমেন্টের একই ব্যাচের। সেই মেয়েও সারাদিন ল্যাবে পড়ে থাকত। আমি মাঝে মাঝে তাদের টুকটাক কিছু কাজ করে দিতাম। যেমন এক্সেলে ডাটা এনালিসিসের কাজ, কোডিং এর কাজ ইত্যাদি। আমি দেখতাম কী কী বিশাল ডাটা তারা প্রতিদিন জেনারেট করে। তাদের প্রতি আমার সম্মান অনেক বেড়ে যেত। শুধু তাদের দুজনের প্রতি না, তাদের ডিপার্টমেন্টের সবার প্রতি। কারণ অনেকেই ল্যাবে কাজ করত।
কোভিডের মধ্যে আমার বন্ধুকে তার ডিপার্টমেন্টের এক স্যার কীভাবে কীভাবে যেন সেন্ট্রাল ফিল্ডের গেস্টরুমে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। কারণ তখন হল বন্ধ। বিশাল একটা রুমে বন্ধু একা থাকত। সাথে আমিও থাকতাম। মাঝে মাঝে ওদের ডিপার্টমেন্টের অন্যরা এসে থাকত (এই রুমে থেকেই আমি IBA তে পরীক্ষা দেই, আবার এই রুমে থেকেই গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিজয় দেখেছি।)। বন্ধু সারাদিন ল্যাবে পড়ে থাকত, আর আমি তখন একটা চাকরিতে ঢুকেছি। আমি সত্যিই বুঝতাম না সে সারাদিন এত কী কাজ করে ল্যাবে। সেই বন্ধু এখন John Hopkins University তে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি করছে।
সেই যে শহীদুল্লাহ হলের নোংরা স্যাঁতসেঁতে রুম থেকে যাত্রা শুরু করে আজ John Hopkins University তে পিএইচডি করা, এই যাত্রার কথা শুনলে শ্রদ্ধায় আপনাদের মাতা নত হয়ে আসে না? শুধু আমার বন্ধু একা না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ডিপার্টমেন্টে এরকম হাজার হাজার স্টুডেন্ট আছে যাদেরকে রাষ্ট্র একটা ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে পারে না, তিনবেলা ন্যূনতম পুষ্টিকর খাবার দিতে পারে না, শুধুমাত্র নিজেদের পরিশ্রমে তারা সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের নাম গৌরবের সাথে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ছেলেমেয়েগুলোকে অপমান করার মন্ত্রী মহোদয়ের কোনো অধিকার আছে?
ঢাবির সুফিয়া কামাল হলের একটা মেয়ের সাথে চার বছর আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আপনারা যাকে প্রেম বলেন তার চেয়েও বেশি কিছু। সেই মেয়ে পড়ত বায়োকেমিস্ট্রিতে। সবসময় তার মাথায় শুধু পড়াশোনা ঘুরত। মাঝে মাঝে আমিই বিরক্ত হতাম। প্রেম করতে গেলে পড়াশোনার কথা শুনতে কার ভালো লাগে? থার্ড ইয়ারে থাকতে সে ফার্মগেটে একটা ড্রাগ ডিজাইনের কোর্সে ভর্তি হলো। শুক্রবার সারাদিন সেখানে পড়ে থাকত। ফোর্থ ইয়ারে তার ফ্যামিলি তাকে একরকম জোর করেই বিয়ে দিয়ে দেয়। শেষদিনগুলোতে আমরা চেষ্টা করতাম সারাদিন একসাথে থাকতে। আবরার ফাহাদ মারা যাওয়ার কারণে বুয়েট তখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। আমি সারাদিন কার্জনে পড়ে থাকতাম। রাত দশটা পর্যন্ত কার্জনের বারান্দায় পাশাপশি বসে থাকতাম, কিংবা শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে বসে পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখতাম (তখন মেয়েদেরকে পুকুরপাড়ে বসতে দিত)। সেই কঠিন বিচ্ছেদের সময়েও সে আমাকে বলত, সে বানরের ব্রেন নিয়ে কী যেন একটা রিসার্চ করবে, স্যারের সাথে নাকি কথা হয়েছে, হ্যান ত্যান। রিসার্চ নিয়ে তার ছিল কী অফুরন্ত উৎসাহ। এই মেয়েটাও কিন্তু সুফিয়া কামাল হলে চারজনের বেডে আটজন থাকত।
সে কোথায় আছে আমি এখন জানি না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেও পৃথিবীর বুকে কোথাও না কোথাও বাংলাদেশের মুখ ঠিক উজ্জ্বল করছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় কি এই মেয়েটির কথা জানেন?
কোভিডের দুই বছর পর ঢাকা ইউনিভার্সিটির আরো একজন মেয়ের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। সে পড়ত কেমিস্ট্রিতে। আমার সাথে যখন তার ভালো সম্পর্ক তখন সে মাস্টার্সে পড়ে। আশ্চর্য ব্যাপার, এই মেয়েও সকাল থেকে সন্ধ্যা সারাদিন ল্যাবে পড়ে থাকত। মোকাররমে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ল্যাবে। আমি সারাদিন অফিস করে বিকেলে মোকাররমের সামনের ফুটপাতে বসে তার জন্য অপেক্ষা করতাম। প্রথম যেদিন সে আমাকে অফিস শেষে মোকাররমে আসতে বলে আমি বাইক নিয়ে বায়তুল মোকাররমের সামনে চলে গিয়েছিলাম। সে আরেক কাহিনী।
মাঝে মাঝে খুব ভোরে সে চলে যেত কাওরান বাজারে। তার রিসার্চের জন্য নাকি চিংড়ির খোলস না কী যেন লাগে, সেটা কিনতে। আমি যদি বলতাম আমি এনে দেই তাহলে সে রাজি হতো না। নিজে দেখে দেখে কিনত। এতই ছিল তার আগ্রহ। সে মাস্টার্স শেষ করেছিল ৩.৮৮ সিজিপিএ নিয়ে। আমাকে হোয়্যাটস এপে রেজাল্ট জানানোর পর আমি যখন তাকে কংগ্রেচুলেশন্স জানাতে যাব, তখন দেখি তার মন খুব খারাপ। সে আরো বেশি আশা করেছিল। অবশ্য আশা করাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ আমি জানতাম সে কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছিল এর পেছনে।
IELTS এর কিছুদিন আগে থেকে সে এত নার্ভাস ছিল যে মনে হচ্ছিল মেন্টাল ব্রেক ডাউন হয়ে যাবে। পরে দেখি IELTS এ পেয়েছে আট। সে এবছর পিএইচডি করতে আমেরিকায় যাবে। ফুল ফান্ডেড অফার পেয়েছে। একদিন সেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। দুঃখের ব্যাপার যে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এই মেয়েটির কথাও জানেন না।
এগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এবার কিছু স্ট্যাটস নিয়ে কথা বলি।
কৌতূহলবশত গতকাল ২০২৫ সালের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কে কীরকম রিসার্চ করেছে তা নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। সঠিক ডাটা পাওয়া খুব কঠিন, কারণ এমন কোনো ওয়েবসাইট নেই যেখানে সব ডিপার্টমেন্টের ডাটা একসাথে থাকে। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের সাইটে গিয়ে আলাদা আলাদা চেক করা তো সম্ভব নয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে Scientific Bangladesh নামের একটা জার্নাল পেলাম। প্রতিবছর বাংলাদেশের মেজর ইউনিভার্সিটিরগুলোর রিসার্চ নিয়ে তারা রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। তো সেখানে যা পেলাম তার সারমর্ম হলো:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালে শুধুমাত্র science-indexed journal এ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে মোট ১২৩৬ টি। আমি চেষ্টা করেছি Q1/Q2/Q3/Q4 আলাদা আলাদা ডেটা বের করতে, কিন্তু পারিনি। কাজটা অসম্ভব ছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে science-indexed এর বাইরেও কিছু আর্টিকেল পাবলিশ হতে পারে কিন্তু সংখ্যাটা খুব কম হবে (১% এর চেয়েও কম)। তাই সেটা আর গুরুত্বপূর্ণ না। উল্লেখ্য, আর্টস বা বিজনেস ডিপার্টমেন্টের ম্যাক্সিমাম রিসার্চও কিন্তু science-indexed এর আওতায় পড়ে।
বুয়েট থেকে ২০২৫ সালে science-indexed journal এ আর্টিকেল পাবলিশ হয়েছে মোট ৭০৮ টি।
এর পরে খুঁজলাম নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। কিন্তু অনেক খুঁজেও নর্থ সাউথ নিয়ে কোনো রিপোর্ট Scientific Bangladesh এর জার্নালে পেলাম না। অন্তত ২০২৫ সালের কোনো রিপোর্ট পাইনি।
আর কিছু খোঁজার ধৈর্য হয়নি।
এই হলো আমার গল্প। বাংলাদেশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে যারা পড়ে তারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। ম্যাক্সিমামের ঢাকা শহরে সুন্দর থাকার জায়গা আছে, তিনবেলা নিরাপদ খাবারের ব্যবস্থা আছে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে। তার ওপর তাদের ফ্যাকাল্টিরা খুব আন্তরিক। তারও ওপর আবার তাদের সিলেবাস অনেক ছোট ও অথোরিটি থেকে ভালো গ্রেড দিতে ফ্যাকাল্টিকে প্রেশার দেওয়া হয় (বানিয়ে বলছি না, এই দুটো বিষয়েও আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা আছে। কেউ শুনতে চাইলে বলব)। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের মেয়েদেরকে ফোর্থ ইয়ারে রিসার্চ নিয়ে মেতে থাকার সময়ে ফ্যামিলি থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয় না।
এতসব সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরও মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় যখন তাদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর রুমে ডাবলিং করে থাকা ছেলেটি বা মেয়েটির তুলনা করেন এবং পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় কম্পিটিশনে তারা ধারেকাছেও নেই তখন সেটা শুধু তাদের জন্য না, এই দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই লজ্জার।
কথাগুলো বুয়েটের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
শেষ কথা, সত্য কথা শুনতে তেতো লাগলেও সত্য সত্যই। আমি কাউকে আঘাত করার জন্য কথাগুলো বলিনি।
ধন্যবাদ সবাইকে।
বি:দ্র: পোস্টটি লিখে কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে গেলাম। শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশাপশি বসে পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখা, কিংবা কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে নীরবতার শব্দ উপভোগ করা, সেই দিনগুলোকে আমি খুব মিস করি। আরো মিস করি গভীর রাতে চানখাঁরপুলের টং দোকানে বন্ধুর সাথে খেতে যাওয়া, কিংবা সিরাজ ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া।
সিরাজ ভাইয়ের চায়ের দোকান কি এখনো আছে? বর্তমানরা জানাবেন প্লীজ।
সামনে আবার বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ গভীর রাতে জগন্নাথ হল বা মহসীন হলের মাঠে ঘুরে ঘুরে দেখতাম। এভাবেই আর্জেন্টিনার বিজয় দেখেছি।এবার আর সেখানে দেখা হবে না।
তবে একটা জিনিস খুব বাজে লাগত। ভোরবেলা দোয়েল চত্ত্বর থেকে চানখাঁরপুল পর্যন্ত মানুষের মলত্যাগের গন্ধে হাঁটা যেত না। সেই গন্ধ কি এখনো পাওয়া যায়?

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে