নবপ্রকাশ ডেস্ক:
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে মারাত্মক আইনি ও কাঠামোগত ত্রুটি ছিল বলে দাবি করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান। তার মতে, এ চুক্তিতে পানি প্রাপ্তির কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ‘আর্বিট্রেশন ক্লজ’ বা সালিশি ধারা রাখা হয়নি। চুক্তি সইয়ের আগে বিষয়গুলো তৎকালেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হলেও তিনি এতে নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন।
শনিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক বই উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন ফারুক সোবহান। রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসানের ‘সেরেনডিপটি ইন ডিপ্লোম্যাসি, বিটুইন প্রোটোকল অ্যান্ড পলিটিক্স’ এবং রাষ্ট্রদূত এম ফজলুল করিমের লেখা ‘ইন সার্চ অব অ্যা রোল মডেল’ শীর্ষক দুটি গ্রন্থের প্রকাশনা উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বে থাকা ফারুক সোবহান এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।
ফারুক সোবহান জানান, ১৯৯৬ সালের চুক্তির পূর্বপ্রস্তুতির দায়িত্ব প্রথমে তার ওপরেই ছিল। তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যাতে এবারের চুক্তিটি ১৯৭৭ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির চেয়ে বেশি সুবিধা প্রদান করে। বিশেষ করে, শুষ্ক মৌসুমে কমপক্ষে ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা (গ্যারান্টি) এবং দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নিরসনে আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ আর্বিট্রেশন বা সালিশি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
তবে ফারুক সোবহানের অভিযোগ, আলোচনার একপর্যায়ে তাকে চুক্তির মূল সমঝোতার প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই দায়িত্ব পান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিব ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর।
চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া মূল্যায়নের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং তিনি নিজে খসড়াটি পর্যালোচনা করেন। সেখানে কোনো ‘গ্যারান্টি’ কিংবা ‘আর্বিট্রেশন’ ক্লজ না দেখে তারা গভীরভাবে চিন্তিত হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আগের দিন তারা তাকে সফর স্থগিত করার পরামর্শ দিয়ে জানান, এসব ক্লজ ছাড়া চুক্তিটি দেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়।
জবাবে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি দিল্লিতে গিয়েই বিষয়টি সমাধান করবেন। তবে বাস্তবে তা ঘটেনি।
দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আই কে গুজরাল বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, চুক্তির সবকিছু চূড়ান্ত, এখন কেবল প্রিন্ট করা বাকি। ফারাক্কা চুক্তি চূড়ান্ত অনুমোদনের সেই মুহূর্তে ফারুক সোবহান প্রধানমন্ত্রীকে আপত্তি তোলার অনুরোধ জানান। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজে কিছু না বলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিবকেই কথা বলতে বলেন।
আই কে গুজরালকে যখন গ্যারান্টি ও সালিশি ধারা অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সবকিছু আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছে। আমলারা শেষ মুহূর্তে ঝামেলা তৈরি করেন।” এরপর গুজরাল যখন চুক্তি প্রিন্টের জন্য পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি চান, তখন শেখ হাসিনা নীরবতা পালন করেন। ভারতীয় পক্ষ সেই নীরবতাকেই ‘সম্মতি’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং ত্রুটিপূর্ণ অবস্থাতেই গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়েও কথা বলেন এই সাবেক কূটনীতিক। তিনি বলেন, চুক্তির আলাপের সময় ভারতকে যুক্ত করে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আশ্বাস পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে সেটি ভেস্তে যায়। তবে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা এখনও জরুরি বলে তিনি অভিমত দেন।
