রবিবার ওই স্থাপনায় আরেকটি হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন। তবে সৌদি আরবের পাশে থাকলেও ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চায় না পাকিস্তান।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানের নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করা হুতি ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে আনে।
গত সপ্তাহে চুক্তির স্বাক্ষরকারীরা জানায়, হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও ট্যাংকারে হামলা পুনরায় শুরু করেছে এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বাব আল-মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে চুক্তি অনুযায়ী সামরিক বাহিনী ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সৌদি আরব এবং পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার মতো সক্ষমতা পাকিস্তানের রয়েছে। তবে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে দেশটির সেনা ও যুদ্ধবিমানের অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে ৬ লাখ ৬০ হাজারের বেশি সদস্য এবং প্রায় ৪০০টি যুদ্ধবিমান ও ভূমিতে হামলা চালানোর বিমান রয়েছে। দেশটি ড্রোনও তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে বিদ্রোহ দমন এবং ভারতের সঙ্গে সংঘাতের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে দেশটিতে সশস্ত্র হামলা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিদ্রোহীদের হামলায় পাকিস্তানের ১ হাজার ২০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।
এদিকে গত সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি বিমান অভিযানে ১০০টি যুদ্ধবিমান অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে পাকিস্তান ও তুরস্ক, কোনো দেশই তাদের পাইলটরা ওই অভিযানে অংশ নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি।
পাকিস্তানের এক সূত্রের দাবি, দেশটি যৌথ অভিযানে সহায়তা করেছে। তবে কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বা জনবল দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর চাপ থাকলেও ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা রয়েছে পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে। দেশটির বড় একটি অংশ ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাদের মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর হাজারো মানুষ শোক প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে, সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তান কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে। এ কারণে দেশটির জনগণের মধ্যে এমন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ কম। এর আগেও সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল পাকিস্তান।
২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও স্থলসেনা চেয়েছিল রিয়াদ। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। পরে পাকিস্তানের সংসদ নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল এবং সরকারটি সামরিক বাহিনীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার অনুরোধ নিয়ে এবার প্রকাশ্য বিতর্কের সুযোগ কম বলে মনে করছেন তারা।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং আর্থিক নির্ভরতার কারণে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে পাকিস্তান। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি এবং অনুমোদনের জন্য সংসদেও তা উপস্থাপন করা হয়নি।
পাকিস্তানের আর্থিক সংকটও দেশটির বিকল্প সীমিত করেছে। সৌদি আরবের কাছ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা ৫ বিলিয়ন ডলারের আমানতের মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এই অর্থ পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৩৮ শতাংশের সমান।
এ ছাড়া গত বছর সৌদি আরবে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিকেরা দেশে ৯.৭৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ফলে দেশটির অর্থনীতিতেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্লেষক উমর করিমের মতে, সৌদি আরবের প্রতি প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার পাকিস্তানকে ইয়েমেনের সংঘাতে আরও জড়িয়ে ফেলতে পারে। এতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশে জনঅসন্তোষও বাড়তে পারে।
