নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পালন করা হচ্ছে বিক্ষোভ। ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের অপসারণসহ পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা মঙ্গলবারও কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। সোমবার ব্যাংকের পর্ষদ সভাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মঙ্গলবার আরও সংগঠিত রূপ নেয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা গ্রাহক ও আমানতকারীরা ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। তারা মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। আন্দোলনকারীদের হাতে বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এ সময় তারা ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষা এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে স্লোগান দেন। গ্রাহক ফোরামের নেতারা অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ নিয়ে গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, অতীতে আলোচিত এস আলম গ্রুপের প্রভাব থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, নতুন নিয়োগ সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিচালনা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি লাখো গ্রাহকের আস্থা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা চেয়ারম্যানের অপসারণের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম জনসম্মুখে আরও স্বচ্ছ করার দাবি জানান। সোমবার আন্দোলনের প্রথম দিনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিলে এলাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের সরে যেতে অনুরোধ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারী এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মতিঝিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে স্বাভাবিক যান চলাচল এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছিল। আন্দোলনকারীদের একাধিকবার স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ করা হলেও তারা তা না মানায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তবে গ্রাহক ফোরামের নেতারা পুলিশের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অংশ। তারা অভিযোগ করেন, বিনা উসকানিতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে এবং এতে অনেক গ্রাহক ও সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। গ্রাহক ফোরামের ঘোষিত পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের অপসারণ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং বিতর্কিত প্রভাবমুক্ত একটি পরিচালনা কাঠামো গঠন। মঙ্গলবার আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের দাবিগুলো উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। প্রয়োজনে দেশব্যাপী গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলারও ইঙ্গিত দেন তারা। এদিকে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কে জড়িয়ে থাকা ব্যাংকটির জন্য গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পরবর্তী কর্মসূচি এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অবস্থানের দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল। ব্যাংকটির চলমান এই সংকট কীভাবে সমাধান হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর দেশের ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের।
