ক্ষমতা, গুম ও বিবেকের দহন: পর্দায় সুপিন বর্মনের নতুন সিনেমা ‘মুখোশ মুখো’
বিনোদন প্রতিবেদক: রাষ্ট্রের ক্ষমতা, গুম, ‘ক্রসফায়ার’ আর এক পুলিশ কর্মকর্তার ভেতরের তীব্র বিবেকের দ্বন্দ্ব—এমন এক অস্বস্তিকর ও রূঢ় বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে এনেছে নতুন ওয়েব সিনেমা ‘মুখোশ মুখো’। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার অধ্যায় ঘিরে নির্মিত এই সিনেমায় মূলত উঠে এসেছে রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য আর মানবিকতার টানাপোড়েনের এক নির্মম গল্প।
গল্পের প্রেক্ষাপট ও মূল ভাবনা
সিনেমার গল্পে মশিউর রহমান একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) অ্যাকটিভিস্ট। রাষ্ট্রের দুর্নীতি ও ক্ষমতার মসনদে বসা রাজনৈতিক নেতাদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মশিউরের এই সাহসী কণ্ঠস্বরই একসময় তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে রাষ্ট্রীয় একটি বিশেষ বাহিনী মশিউরকে গোপনে তুলে নিয়ে গুম করে।
রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হয়ে মশিউরকে গুম করার এই মিশনে নেতৃত্ব দেন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা মিনহাজ। এর আগেও বেশ কয়েকটি ‘এনকাউন্টার’ অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি। তবে বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্য ভেতরে–ভেতরে রীতিমতো অনুতপ্ত ও দগ্ধ হচ্ছিলেন মিনহাজ। মশিউরকে ‘এনকাউন্টার’–এ হত্যার চূড়ান্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নিজের বিবেকের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্বে জড়ান তিনি। মশিউরকে জিজ্ঞাসাবাদের (ইন্টারোগেশন) সময় তাঁর ভেতরের প্রতিবাদী ও সাহসী সত্ত্বাকে আবিষ্কার করেন মিনহাজ।

একদিকে মানবিকতার ডাক, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অমোঘ আদেশ—কোনটা বেছে নেবেন, তা নিয়ে চরম দোটানায় পড়েন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তবে শেষ পর্যন্ত বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে মশিউরকে ‘এনকাউন্টার’–এই হত্যা করতে বাধ্য হন মিনহাজ। জেনেশুনে একজন নিরপরাধ তরুণকে হত্যার পর মানসিক যন্ত্রণায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মিনহাজ আবিষ্কার করেন—রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোশাকী মুখোশের আড়ালে তিনি নিজেই একজন ভয়ংকর অপরাধী হয়ে উঠেছেন।
সত্য ঘটনা ও নির্মাণ
২০১৮ সালে দেশে ঘটে যাওয়া একটি আলোচিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সত্য কাহিনি অবলম্বনে ‘মুখোশ মুখো’ নির্মাণ করেছেন তরুণ ও প্রতিভাবান পরিচালক সুপিন বর্মন। এর আগেও তাঁর পরিচালিত বেশ কিছু ওয়েব ফিল্ম দর্শকনন্দিত হয়েছে এবং দেশ–বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছে। রাষ্ট্রের অনুগত একটি বাহিনীর কর্মকর্তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিক সত্ত্বাকে এই চলচ্চিত্রে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
জমকালো প্রিমিয়ার শো
গত শনিবার বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘মধুবন সিনেপ্লেক্স’-এ সিনেমাটির একটি বিশেষ প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সিনেমাটির সাফল্য কামনা করে বক্তব্য দেন:
রেজাউল করিম বাদশা, সংসদ সদস্য (বগুড়া-৬)
মোশারফ হোসেন, সংসদ সদস্য (বগুড়া-৪)
এম আর ইসলাম স্বাধীন, প্রশাসক, বগুড়া সিটি করপোরেশন
মোজাম্মেল হক, সম্পাদক, দৈনিক করতোয়া
মো. আলী হায়দার, হেড অব কনটেন্ট, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’।
প্রিমিয়ার শোতে পরিচালক সুপিন বর্মন তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন:
“রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে কীভাবে নিরীহ মানুষ গুম ও ক্রসফায়ারের শিকার হন এবং এর মাধ্যমে কীভাবে চরম মানবতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, তা-ই এখানে দেখানো হয়েছে। এ কারণে ‘মুখোশ মুখো’ সিনেমাটি সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতাদের আরও বেশি করে দেখা দরকার।”
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’ (Bongo)-র হেড অব কনটেন্ট মো. আলী হায়দার জানান, আসন্ন ঈদের চতুর্থ দিন জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বঙ্গ বিডিতে (Bongo BD) ‘মুখোশ মুখো’ সিনেমাটির শুভ মুক্তি ঘটবে।
বর্মন ফিল্মসের ব্যানারে প্রযোজিত এই সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন—বিভান বাদল, বিধান রায়, কবীর রহমান, মশিউর রহমান, বৈশালি, রওজা, নাজনীন বেগম, সাজিয়া আফরিন, সাজিদ আহমেদ, রবিউল রবি, ভাস্কর অভি, শিল্পা মৈত্র, রথি, সবুজ চন্দ্র, স্বাধীন, ফয়সাল প্রমুখ। চলচ্চিত্রটির আবহ ও সংগীত পরিচালনা করেছেন হিমেল।
রাজনৈতিক থ্রিলার ও বাস্তবধর্মী গল্পের প্রতি যাদের আগ্রহ রয়েছে, ওটিটিতে ‘মুখোশ মুখো’ সিনেমাটি তাদের জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।
