জহিরুল ইসলাম রাতুল: মাগুরার সেই ছোট্ট শিশুটির মুখটা কি মনে পড়ে? আমরা কি ভুলতে পেরেছি সেই শোক? না, পারিনি। কারণ একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে, তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। শিশুটির আর্তনাদ যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করেছে—এই সমাজে নারী ও শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ? কিন্তু এই প্রশ্ন নতুন নয়। গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে একই ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। প্রতিবারই আমরা প্রতিবাদ করেছি, মিছিল করেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ঝরিয়েছি। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু থেমে গেছে। অপরাধীরা অনেকেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে, বিচার ঝুলে থেকেছে বছরের পর বছর, আর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে চাপা দিয়েছে। মাগুরার শিশুটি কিংবা রামিসার ঘটনা নিয়ে দেশ কাঁদছে। কিন্তু এর আগে কি আমরা তনুকে ভুলিনি? নুসরাতকে ভুলিনি? এমসি কলেজের সেই তরুণীকে ভুলিনি? নোয়াখালীর ভিডিও ভাইরাল হওয়া সেই নারীর আর্তনাদ কি এখনো আমাদের কানে বাজে? বাংলাদেশের গত ১২ বছরের ইতিহাস যেন নারী ও শিশু নির্যাতনের এক দীর্ঘ রক্তাক্ত অধ্যায়।
গত ১২ বছরের আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড: এক ভয়াবহ বাস্তবতার সারসংক্ষেপ:
২০১৩ সালে আশুলিয়ায় এক পোশাকশ্রমিক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, শ্রমজীবী নারীর নিরাপত্তাও কতটা অনিশ্চিত।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাও বাড়তে থাকে, কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাই স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে চাপা পড়ে যায়।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জিনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। রাজধানীর মতো শহরেও একজন তরুণী কতটা অনিরাপদ—এই ঘটনা তা স্পষ্ট করে দেয়।
এই সময় থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “নারীর নিরাপত্তা” প্রশ্নটি জোরালো হতে থাকে।
ঢাকার মহাখালীতে বাস থেকে নামার পর এক গারো তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি দেশব্যাপী ক্ষোভের জন্ম দেয়। ভুক্তভোগী আদিবাসী হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নারী শুধু রাস্তায় নয়, গণপরিবহন ও জনবহুল এলাকাতেও নিরাপদ নয়।
২০১৬: তনু হত্যা—যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয় সেনানিবাস এলাকার ভেতরে। অভিযোগ ওঠে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তনুর মৃত্যু পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। “আমি তনু হতে চাই না”—এই স্লোগান রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘ তদন্ত, একাধিক ময়নাতদন্ত, আন্দোলন, সবকিছুর পরও আজও এই হত্যার বিচার সম্পূর্ণ হয়নি। তনু যেন বিচারহীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
২০১৬ সালে স্কুলছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়, কারণ সে উত্ত্যক্তকারীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, নারীর “না” বলার অধিকারও এই সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না।
২০১৭ সালজুড়ে দেশে অসংখ্য শিশু ধর্ষণের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে। বিশেষ করে মাদ্রাসা, স্কুল এবং পারিবারিক পরিবেশে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এ সময় শিশু ধর্ষণের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেক শিশুই নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হয়।
২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারী শিক্ষার্থী ও কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ উঠে।কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রকাশ্যে আসতে পারেননি।
২০১৯ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নারীনির্যাতনের ঘটনাগুলোর একটি ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন। এর জেরে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে নুসরাত বলেছিলেন, “স্যার আমার গায়ে আগুন দিয়েছে।” এই ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। পরে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে রায় হলেও নুসরাত বাংলাদেশের নারীদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকেন।
২০২০ সালে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
একই বছর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। মানুষ রাস্তায় নেমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে। এই সময় সরকার ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করে আইন সংশোধন করে।
২০২১ সালে সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার খবর প্রকাশ হতে থাকে। বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করেন—বাংলাদেশে শিশু নিরাপত্তা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।
২০২২ সালে অনেক আলোচিত মামলার বিচার ঝুলে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে। নারী অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেন, মামলা দায়েরের পর ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি, সামাজিক চাপ এবং আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেক পরিবারই বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারে না।
২০২৩: সাইবার হয়রানি ও যৌন সহিংসতার নতুন মাত্রা
এই সময়ে নারী ও শিশুদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন হেনস্তা এবং সাইবার যৌন সহিংসতা বাড়তে থাকে। অনেক কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সামাজিক অপমানের ভয়ে।
২০২৪: নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের এক গবেষণায় উঠে আসে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নির্যাতনের শিকার হন।
২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমে কম আলোচিত হলেও নারী ও শিশু নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ঘটনাই স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসা বা চাপের মুখে ধামাচাপা পড়ে যায়।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে বহু গুণ বেশি।
২০২৬ সালের ৬ মার্চ মাগুরা শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হয় আছিয়া নামের শিশুটি। প্রথমে তাকে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। এরপর ৭ মার্চ রাতে তাকে ভেন্টিলেশনে নেয়া হয়।
৮ মার্চ সন্ধ্যায় সংকটাপন্ন অবস্থায় শিশুটিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির চিকিৎসায় সিএমএইচের প্রধান সার্জনকে প্রধান করে ৮জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। ধর্ষণের ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে চার জনের নামে মামলা করেন। ধর্ষণের অভিযোগে শিশুটির ভগ্নিপতি সজীব (১৮), সজীবের ভাই রাতুল (১৭), তাদের বাবা হিটু মিয়া (৪২) ও মা জাবেদা বেগমকে (৪০) গ্রেফতার করে পুলিশ।
এরপর ২০২৬ সালের ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার অভিযোগ, বীভৎস এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনাগুলো আবারও প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সত্যিই কোনো শিক্ষা নিয়েছি?
কেন থামছে না এই সহিংসতা?
বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার খুব অল্প অংশেই চূড়ান্ত সাজা হয়। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় অপরাধীরা ভয় পায় না। এখনো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। “মেয়েটির পোশাক কেমন ছিল”, “রাতে বাইরে কেন গিয়েছিল”—এসব প্রশ্ন অপরাধীকে আড়াল করে।
অনেক শিশু পরিবারের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্তু “সম্মান রক্ষার” নামে পরিবারগুলো ঘটনা গোপন রাখে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিচারকে প্রভাবিত করে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
কী করতে হবে এখন?
পরিবারকে সচেতন করতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই “সেফ টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠন জরুরি। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখাতে হবে পরিবার থেকেই। রাষ্ট্রকে সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা কার্যকর করতে হবে।
আমরা কি সত্যিই বদলাতে চাই?
প্রতিটি ঘটনার পর আমরা বলি—“এবার আর চুপ থাকা যাবে না।” কিন্তু কিছুদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। এই নীরবতা, এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধীদের সাহস দেয়। তনু, নুসরাত, রিশা, রামিসা কিংবা মাগুরার সেই শিশুটি শুধু কিছু নাম নয়। তারা বাংলাদেশের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারবো, যেখানে কোনো মা তার সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কে থাকবে না? যেখানে কোনো শিশু পরিচিত মানুষের লালসার শিকার হবে না? যেখানে ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে আর কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর কাঁদতে হবে না? পরিবর্তনের সময় এখনই। কারণ আরেকটি রামিসা, আরেকটি তনু, আরেকটি নুসরাতের গল্প শোনার মতো নিষ্ঠুরতা আমাদের আর দেখানো উচিত নয়।
