ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » ঢাকার প্রথম পাঠাগার:দেড়শ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী যে প্রাঙ্গণ

ঢাকার প্রথম পাঠাগার:দেড়শ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী যে প্রাঙ্গণ

 

রাজধানীর বিবর্তনশীল জনপদ পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন দ্বিতীয় গেট থেকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের দিকে এগোলে দৃষ্টি কাড়ে এক প্রাচীন স্থাপত্য। যার নির্মাণশৈলী ও বিভিন্ন বোর্ডে লেখা ইতিহাসের বর্ণনা জানান দিচ্ছে এর দেড়শ বছরের পুরনো পরিচয় রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি। রাজধানীর বিদ্যানুরাগীদের প্রথম আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই পাঠাগারটি সুদীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার জ্ঞানচর্চার বিবর্তনের এক অনন্য উপাখ্যান হয়ে টিকে আছে।

 

উনিশ শতকের নবজাগরণ ও পাঠাগারের সূচনার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় যে ব্রাহ্ম সমাজের পত্তন করেছিলেন, তারই সাংস্কৃতিক ফসল হিসেবে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই পাঠাগার। ঢাকার নাট্য আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব অভয় চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে এই লাইব্রেরিটি তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এর নামকরণ করা হয়।

 

একসময় এই পাঠাগারের সংগ্রহে ছিল ৩০ হাজারেরও বেশি অমূল্য গ্রন্থ। ব্রাহ্ম ধর্মীয় শাস্ত্র থেকে শুরু করে সাহিত্য ও দর্শনের আকর গ্রন্থগুলোর সন্ধান মিলত এখানে। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে এই অমূল্য সম্পদগুলো লুণ্ঠিত হয়।

 

 

এই পাঠাগারটি কেবল বইয়ের ঘর নয়, এটি ছিল বিভিন্ন সনামধন্য মণীষীদের চিন্তার সুষ্ঠ চর্চাকেন্দ্র। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, ১৮৯৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা সফরে এসে যে তিনটি দর্শনীয় স্থানের কথা উল্লেখ করেছিলেন, এই পাঠাগার ছিল তার অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখানে পদধূলি দিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, কবি শামসুর রাহমান এবং বেগম সুফিয়া কামালের মতো বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এখানে নিয়মিত সময় কাটিয়েছেন।

 

বর্তমানে ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছোট্ট একটি কক্ষে স্থানান্তরিত পাঠাগারটিতে ঢুকলে আজও দেয়ালে টাঙানো মণীষীদের আলোকচিত্রগুলো সেই সোনালী অতীতকে মনে করিয়ে দেয়।

 

এই পাঠাগার ও ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাসের সাথেই মিশে আছে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি শেকড়। ১৮৬৩ সালে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীদের উদ্যোগে আরমানিটোলায় যে ‘ব্রাহ্ম স্কুল’ শুরু হয়েছিল, ১৮৬৮ সালে তার দায়িত্ব নেন জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। তিনি তার পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে স্কুলটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করেন, যা কালক্রমে কলেজ ও ২০০৫ সালে কলেজ থেকে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ, এই প্রাঙ্গণটি কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং আধুনিক উচ্চশিক্ষার এক বিবর্তনের সাক্ষী।

 

 

২০০৪ সালে রাজউক ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। অতঃপর ২০০৫ সালে ট্রাস্টি ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। যারাই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫-২০১৪ পর্যন্ত লাইব্রেরিটি বন্ধ ছিল, যা পরে আংশিক আইনি লড়াই শেষে স্বল্প সংস্কারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। যদিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখনও এই মামলা জটিলতা চলমান রয়েছে।

 

পুরান ঢাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের প্রজন্মের কাছে এই লাইব্রেরিটি ইতিহাসের এক গভীর শেকড়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, এমন একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমরা এলাকাবাসী চাই, দ্রুত এই সম্পদটি যথাযথভাবে সংস্কার করা হোক এবং এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে অবগত করা হোক।”

 

স্থাপনাটির বর্তমান সংকট তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি বলেন, “গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার যে ঐতিহ্য এখানে ছিল, তা এখন অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। আপনারা ইতিহাস ঘাটলে বা অনলাইন থেকে জানতে পারবেন এটার কতো সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। এককালে নামী সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন, কিন্তু চলমান মামলার কারণে আমরা বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না।”

 

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, “শুধু এই স্থাপনা নয়, সম্ভবত এটিসহ মোট প্রায় ৯৭ টির মতো স্থাপনার বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে। যেহেতু সেটি এখনও চলমান তাই আইনগত জটিলতার কারনে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

হাবিবুর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে