আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সংবাদমাধ্যমে প্রশাসনের কৌশলগত ও স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসকারী সরকারি কর্মকর্তাদের চরম শাস্তি হিসেবে ‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অ্যারিজোনার বুলহেড সিটিতে আয়োজিত এক উত্তপ্ত নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সরকারের গোপনীয় তথ্য ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য চরম পরিণতি ভোগ করা উচিত। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ তথ্য বের হয়ে যাওয়া রোধে তাঁর প্রশাসনের নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানের কথা আবারও বিশ্বমঞ্চে বিশ্বস্ততার সাথে স্পষ্ট করলেন তিনি।
জনসভায় ট্রাম্প বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত মতে যারা দেশের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গোপন কৌশলগত তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দেয়, তাদের গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের ওপর এক সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের সময় নির্ধারিত সময়সূচি ও বিস্তারিত বিবরণ প্রশাসনেরই এক অসাধু কর্মকর্তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মিসৌরি থেকে রাত ১২টা বেজে ৭ মিনিটে কখন সেনা বিমান উড়াল দেবে, সেই সুনির্দিষ্ট সময় ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘সিএনএন’-এর মতো গণমাধ্যমে চলে যায়। যারা এই ধরনের চরম গোপনীয় তথ্য বাইরে ছড়িয়ে দেয়, তারা ‘পৃথিবীর আবর্জনা’। তাদের হয় আমৃত্যু কারাগারে রাখা উচিত, নয়তো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।”
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের তীব্র আক্রমণ
ট্রাম্প এর আগেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে একাধিকবার ‘জনগণের আসল শত্রু’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অ্যারিজোনার ওই জনসভায় উপস্থিত সাংবাদিকদের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে তিনি অভিযোগ করেন যে, ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচার করার মাধ্যমে সাংবাদিকরাও কার্যত তথ্য ফাঁসকারীদের মতোই অপরাধমূলক অপকর্মে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।
প্রশাসনের নজিরবিহীন কড়াকড়ি ও পলিগ্রাফ টেস্ট
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন তথ্য ফাঁস রোধে অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। প্রতিটি সরকারি সংস্থায় নতুন ও পুরোনো কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তা বজায় রাখার মুচলেকায় স্বাক্ষর করানোর রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
সম্প্রতি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের তদন্তের অংশ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট স্টাফের প্রায় ৫০ জন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে জোরপূর্বক ‘পলিগ্রাফ’ বা মিথ্যা শনাক্তকরণ লাই-ডিটেক্টর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এর আগে চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে এক সরকারি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে গোপনীয় নথি রাখার অভিযোগের তদন্ত সূত্রে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক নারী সাংবাদিকের বাসভবনে এফবিআই তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আদালত ওই বাজেয়াপ্ত নথি ব্যবহারের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। এছাড়া গত জুনে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর চারজন সাংবাদিককে গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার জোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল, তবে সংবাদমাধ্যমগুলোর তীব্র আইনি প্রতিবাদের মুখে প্রশাসন সেই সমন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গণমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও তথ্যসূত্রের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের এই চরম ও আগ্রাসী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মুক্ত সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকারের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ও আশঙ্কার মেঘ এঁকে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
