নবপ্রকাশ ডেস্ক:
চারপাশে থৈ থৈ পানি থাকলেও সাতক্ষীরার সুন্দরবন ঘেঁষা উপকূলীয় মানুষের বছরের পর বছর ধরে ছিল সুপেয় মিষ্টি পানির হাহাকার। খাবার পানির জন্য নারী ও শিশুদের প্রতিদিন কয়েক মাইল দীর্ঘ পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হতো, নতুবা পান করতে হতো নোনাজল—যার কারণে বছরজুড়ে নানা পেটের পীড়ায় ভুগতে হতো উপকূলের পরিবারগুলোকে। অবশেষে সেই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটেছে।
গতকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াধাট ও কৈখালী গ্রামে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের উদ্যোগে আধুনিক দুটি রিভার্স অসমোসিস (RO) সুপেয় পানি শোধনাগার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে।
ডিজিটাল কার্ড ও সৌরবিদ্যুতে চলছে ওয়াটার প্ল্যান্ট
উপকূলীয় এই প্রযুক্তিনির্ভর পানীয় জল প্রকল্পের সুবিধাভোগী প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড। সেন্সরযুক্ত কলের সামনে কার্ডটি ধরলেই অটোমেটিক মিষ্টি পানি পড়ে এবং কার্ড সরিয়ে নিলেই পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়, ফলে এক ফোঁটা পানিও অপচয় হয় না।
এর পাশাপাশি প্রতিটি প্লান্টে ১০টি করে শক্তিশালী সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের শক্তিতেই পাম্প ও শোধনাগার পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয় পল্লীবিদ্যুতের ওপর কোনো চাপ পড়ছে না। এই স্বয়ংক্রিয় প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাব’-এর সদস্যদের, যা স্থানীয় বেকারত্ব কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
উপকূলবাসীর স্বস্তি ও আনন্দ
খাগড়াঘাট গ্রামের রহিমা বেগম (৪৫) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আগে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি আনতে গিয়ে ঘরের মেয়েদের বিদ্যালয় কামাই হতো। বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখতাম, আর বাকি সময় ছিল তেতো নোনাপানি। এখন বাড়ির কাছে বোতাম টিপলেই মিষ্টি পানি বের হচ্ছে, এই প্রযুক্তি আমাদের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।”
কৈখালী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন জানান, আগে এক কলস মিষ্টি পানির জন্য দুই-তিন মাইল কষ্ট করে হাঁটতে হতো, এখন বাড়ির কাছে নিরাপদ পানি পেয়ে যেন তাঁদের নতুন জন্ম হয়েছে।
উদ্বোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা
শ্যামনগরের খাগড়াঘাট গ্রামের নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং কৈখালীর আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে শোধনাগার দুটি স্থাপন করা হয়েছে। এটি উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ।
তিনি জানান, “উপকূলীয় অঞ্চলের এই প্রান্তিক মানুষের সুপেয় পানির সংকট আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান দিতে, যা মানুষের জীবন বাঁচাবে এবং শিশুদের সুস্থ বেড়ে ওঠায় সহায়তা করবে।”
গবেষণাগারের চমকপ্রদ রিপোর্ট
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (DPHE) খুলনা আঞ্চলিক ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই শোধনাগার চালুর পর পানিতে ক্ষতিকর লবণ ও খনিজের (TDS) মাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে কমে এসেছে।
-
কৈখালী: সাধারণ নলকূপের পানিতে যেখানে লবণের পরিমাণ (টিডিএস) ছিল প্রতি লিটারে ৮,২১৭ মিলিগ্রাম, শোধনের পর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ মিলিগ্রামে। পানিতে আয়রনের পরিমাণ ১ মিলিগ্রাম থেকে কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ০১ (০.০১) মিলিগ্রামে।
-
খাগড়াঘাট: শোধনের আগে টিডিএস ছিল ৪,০৮১ মিলিগ্রাম, যা শোধনের পর নেমে এসেছে মাত্র ৯২ মিলিগ্রামে (যেখানে সরকারি নিরাপদ মাত্রা ১,০০০ মিলিগ্রামের মধ্যে)।
শ্যামনগরের স্থানীয় চিকিৎসক আমজাদ হোসেন জানান, আয়রন ও লবণমুক্ত এই পানি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং এর মাধ্যমে উপকূলে পেটের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা, চর্মরোগ ও দাঁত ক্ষয়ের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুলাংশে কমে আসবে।
