দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি: সুন্দরবন রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে খুলনার দাকোপ উপজেলার বুড়িরডাবুর এসইএসডিপি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমধর্মী পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়াইল্ডটিম (WildTeam)-এর উদ্যোগে রোববার (১৬ আগস্ট) আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, উপস্থিত বক্তৃতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জরিপসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে বিদ্যালয়ের মাঠ, শ্রেণিকক্ষের আশপাশ, চলাচলের পথ ও খোলা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক, কাগজ, পলিথিন, বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে অপসারণ করেন। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি তারা বর্জ্য আলাদা করার প্রাথমিক ধারণাও লাভ করেন, যা ভবিষ্যতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে।
কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ ছিল পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক উপস্থিত বক্তৃতা। এতে শিক্ষার্থীরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশের গুরুত্ব, প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা এবং সুন্দরবনের সুরক্ষায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পরিবেশ রক্ষার অভ্যাস ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয় এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা ভবিষ্যতে সমাজে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
এ সময় বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিতে একটি বর্জ্য বিষয়ক জরিপও পরিচালনা করা হয়। জরিপের মাধ্যমে বর্জ্যের ধরন, পরিমাণ, কোথায় বেশি বর্জ্য জমছে এবং কীভাবে তা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের তথ্য ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে বুড়িরডাবুর এসইএসডিপি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, বন বিভাগের প্রতিনিধি, আর্থস্কাউট সদস্য এবং ওয়াইল্ডটিমের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের উৎসাহিত করেন।
বক্তারা বলেন, সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে এর আশপাশের এলাকার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ সংরক্ষণে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডটিম জানায়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সুন্দরবন সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদ্যালয়ভিত্তিক এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে।
কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়—“পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুরক্ষিত সুন্দরবন।” একই সঙ্গে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন বিভাগ, আর্থস্কাউট, তরুণ স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক উদ্যোগ শুধু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সুন্দরবন সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
