নবপ্রকাশ ডেস্ক:
দুর্গাপূজা মানেই মণ্ডপে মণ্ডপে কাশের বনে দোলা দেওয়া সুর আর ঢাকের মন্ত্রমুগ্ধকর তালের ঝংকার। মহাষষ্ঠীর প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর বিসর্জন—পূজার প্রতিটি পর্বে ঢাকের সুর ছাড়া উৎসব যেন অসম্পূর্ণ। আর শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঢাকের সেই দূরন্ত বাদ্যদল খুঁজে নিতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসে এক শতবর্ষী ব্যতিক্রমী হাট। এটি ‘কটিয়াদীর ঢাকের হাট’।
হাট নাম হলেও এখানে মূলত বাদ্যযন্ত্র বিক্রির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ঢাকিদের সহজাত দক্ষতা, বাদ্যদলের চুক্তি বা বায়না এবং শত বছরের পুরোনো সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
রাজা নবরঙ্গ রায়ের জনশ্রুতি ও ইতিহাসের শুরু
কটিয়াদীর ঐতিহাসিক এই ঢাকের হাটের সূচনাকে ঘিরে স্থানীয় লোকমুখে জড়িয়ে রয়েছে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের নাম। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, রাজপ্রাসাদে রাজকীয় দুর্গাপূজার আয়োজনকে আড়ম্বরপূর্ণ ও বর্ণিল করতে প্রয়োজন হতো সেরা ঢাকির দল। তৎকালীন বিক্রমপুর অঞ্চলে বিশেষ বার্তা পাঠাতেন রাজা। সেখানকার ঢাকিরা দূর নৌপথে এসে সমবেত হতেন পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের ঐতিহাসিক যাত্রাঘাটে। সেখানে রাজা নিজে দাঁড়িয়ে বাজনা শুনে পছন্দের সেরা দলটি নির্বাচন করতেন। সেই যাত্রাঘাটের বাদ্য আসর থেকেই কালক্রমে জন্ম নেয় আজকের কটিয়াদীর ঐতিহাসিক ঢাকের হাট।
পরবর্তীতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সুবিধার তাগিদে যাত্রাঘাট থেকে সরে কটিয়াদীর পুরানবাজার এলাকায় স্থায়ীভাবে বসতে শুরু করে এই বৈচিত্র্যময় হাট।
১০ জেলার ঢাকিদের মিলনমেলা ও দক্ষতা যাচাই
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে কটিয়াদীর এই হাটে দেশের অন্তত ১০টি জেলা থেকে শত শত বাদ্যদল সমবেত হন। ঐতিহাসিক বিক্রমপুর (মুন্সীগঞ্জ), নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, হবিগঞ্জ এবং ঢাকা ও সিলেটের আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন এসব ঢাকিরা।
হাটে কেবল ঢাক নয়; ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি ও করতালের সম্মিলিত রিমঝিম বাজনায় পুরো পুরানবাজার এলাকা রূপ নেয় এক জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের নগরীতে। বিভিন্ন পূজামণ্ডপ কমিটির আয়োজকেরা হাটে এসে সরাসরি ঢাকিদের পরিবেশনা শোনেন। দলের সদস্য সংখ্যা, বাজনার ছন্দ, কাজের অভিজ্ঞতা ও যাতায়াত বিবেচনা করে দরদাম ও চুক্তির মাধ্যমে বায়না চূড়ান্ত করা হয়।
ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা ও জীবিকার সমীকরণ
কটিয়াদীর ঢাকের হাট একদিকে যেমন শতাব্দীর পুরোনো লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে, অন্যদিকে এটি প্রান্তিক বাদ্যশিল্পীদের মৌসুমি জীবিকা অর্জনের প্রধান ক্ষেত্র। পূজা মৌসুমে উপযুক্ত পারিশ্রমিকে বায়না পাওয়ার মাধ্যমে ঢাকিরা তাঁদের পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা করেন। ধর্মীয় প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কটিয়াদীর এই মেলবন্ধন দেশের লোকসংস্কৃতির মানচিত্রে স্থানটিকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ।
