নবপ্রকাশ ডেস্ক:
নতুন সরকার। সামনে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি। সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা সমস্যা, সংকট দূর করা। বাড়াতে হবে শিক্ষার মান, দিতে হবে শিশুদের স্কুল ড্রেস ও মিড-ডে মিল। থামাতে হবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কান্না। রয়েছে ডিজিটাল ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, নতুন এমপিওভুক্তির চাহিদা। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দ চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান ব্যয়সীমার বাইরে অতিরিক্ত ২৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা চেয়েছে। এই টাকা দিয়ে শিক্ষায় বড় ধরনের রূপান্তর করা হবে। এরই মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শিক্ষা খাতে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেটের নথি অনুযায়ী, শিক্ষায় জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষার চলতি বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। সামনে এ বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়বে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকার চূড়ান্ত ব্যয়সীমার বাইরে আরও ২৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত চাহিদা পাঠানো হয়েছে, যার প্রতিশ্রুতিও মিলেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য মোট বাজেট চাওয়া হয়েছে ৮৬ হাজার ৫১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগ প্রথমে ৫০ হাজার ৩১৯ কোটি টাকার প্রাথমিক ব্যয়সীমা নির্ধারণ করলেও পরে তা বাড়িয়ে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার চূড়ান্ত সিলিং নির্ধারণ করা হয়। তবে উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা বাড়ানো হলেও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে দেওয়ায় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে— এমনটি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি অর্থ বিভাগের কাছে ডিও (আধাসরকারি পত্র) পাঠিয়ে তিনি খাতাওয়ারি বরাদ্দের চাহিদা দেন। যদিও সোমবার পাস হওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১০ হাজার কোটি টাকা
শিক্ষায় বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে চায় সরকার, সেজন্য শুধু নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। এজন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়। ২৮টি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও প্রাথমিক স্কুলে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। সব শিক্ষার্থীর জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক, কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে মিড-ডে মিল নিয়মিত রাখা হবে। নারীদের স্নাতকোত্তর আর পুরুষদের স্নাতক পর্যন্ত ফ্রি শিক্ষা দেওয়া হবে।
এসব প্রোগ্রামে ব্যয় এরই মধ্যে শুরু করেছে সরকার। মার্চ-আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৮০ দিনের ক্র্যাশ প্রোগ্রামে ব্যয় হবে ৪৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই-আগস্ট মাস আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অন্তর্ভুক্ত। পরের ১০ মাসের আলাদা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা লাগবে, অর্থাৎ শুধু নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির জন্য।
গত সোমবার পাস হওয়া এডিপিতে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। চতুর্থ স্থানে থাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এডিবির প্রায় ১৬ শতাংশ।
অবসরে গিয়েও তাদের জমানো টাকা পাচ্ছেন না ১ লাখ ৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। অর্থ সংকট, দুর্নীতির কারণে চার থেকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শিক্ষকদের কান্না থামাতে প্রয়োজন ১০ হাজার কোটি টাকা।
নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অবসর সুবিধা বোর্ডে ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, কল্যাণ ট্রাস্টে ৪৫ হাজার ৮২৪টি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য দরকার ২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। একসঙ্গে সব টাকা না দিলেও বাজেটে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে দুটি বোর্ড। এর মধ্যে অবসর বোর্ডের জন্য ২ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে।
শিক্ষার বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ৩২টি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। সাধারণ ও মেধাবৃত্তি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তির হার দ্বিগুণ করেছে সরকার। এজন্য এ খাতে অতিরিক্ত ১৫১ কোটি টাকা দরকার।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন করে এমপিওভুক্ত করতে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি টাকা, নতুন শিক্ষক নিয়োগ, বাড়িভাড়া ও উৎসব ভাতা বাড়ায় ৪ হাজার ৮৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত চাওয়া হয়েছে। জাতীয়করণ হওয়া প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে লাগবে ৭৫০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে রাজধানীর সাতটি কলেজ নিয়ে গঠিত নতুন ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির’ কার্যক্রম চালুর জন্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৪ কোটি ৫৭ লাখ এবং আগামী অর্থবছরের মূল বাজেট থেকে ২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত ২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
নতুন শিক্ষাক্রমের বই মুদ্রণ, লেখক-পরিমার্জকদের সম্মানী এবং ডিজিটাল কনটেন্ট উন্নয়নের জন্য এনসিটিবির অতিরিক্ত ৩১০ কোটি টাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামত, ভবন নির্মাণ ও আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ২৩১ কোটি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
