বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্যই যেখানে খদ্দেরকে আকর্ষণ করা, সেখানে অনেক সময়ই সত্য-মিথ্যার সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়। বিশেষ করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ওজন কমানো বা শারীরিক গঠনের পরিবর্তনমূলক পণ্যের চটকদার বিজ্ঞাপনে অধিকাংশ দাবিই সত্যের কষ্টিপাথরে টিকে না। সাধারণত তারকাদের বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্যের পসরা সাজায়। তবে শুধুই পারিশ্রমিক নয়, যেসব পণ্যের বিজ্ঞাপনে তারা মুখ দেখাচ্ছেন, তার সামাজিক প্রভাব ও সত্যতা যাচাই করার একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা সেলিব্রিটিদের ওপরও বর্তায়।
সম্প্রতি সেই দায়বদ্ধতার জায়গায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন বলিউডের তিন প্রথম সারির সুপারস্টার—শাহরুখ খান, অজয় দেবগন এবং টাইগার শ্রফ। পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধ তামাকজাত পণ্য ‘পান মসলা’ প্রচারের অভিযোগে মহারাষ্ট্রের ‘খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন’ (এফডিএ) এই তিন অভিনেতাকে কড়া কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে।
২০২৪ সালে ‘বিমল’ ব্র্যান্ডের ‘এলাইচি’ (এলাচ) প্রচারের জন্য একটি বিজ্ঞাপনে একসঙ্গে অভিনয় করেন শাহরুখ, অজয় ও টাইগার। বিমল মূলত একটি জনপ্রিয় পান মসলা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। অথচ মহারাষ্ট্র রাজ্যে পান মসলার উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গত ১১ আগস্ট মহারাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা প্রধান তুকারাম মুন্ডে এই ৯ পৃষ্ঠার নোটিশটি জারি করেন। নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
অবিলম্বে প্রচার বন্ধ: অভিনেতাদের অবিলম্বে এই বিজ্ঞাপনের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং তাদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে এ সংক্রান্ত সব কনটেন্ট সরিয়ে নিতে হবে।
বিজ্ঞাপনে ‘বিমল এলাইচি’ নামটি এমন কৌশলে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভোক্তাদের সরাসরি ‘বিমল পান মসলা’র কথা মনে করিয়ে দেয়। এলাইচির আড়ালে এটি মূলত একটি নিষিদ্ধ পণ্যের ব্র্যান্ড ইমেজকে বাঁচিয়ে রাখা এবং খদ্দেরদের প্রলুব্ধ করার অপচেষ্টা।
তুকারাম মুন্ডে অভিনেতাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর চুক্তিপত্র, ক্যাম্পেইনের বিবরণ, পারিশ্রমিকের নথিপত্র এবং বিজ্ঞাপনটি করার আগে তারা কী ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার প্রমাণপত্র তলব করেছেন। ভোক্তা সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনে অংশ নিলে ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য যেকোনো বিজ্ঞাপনে কাজ করা থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে।
বিজ্ঞাপনের এই ফাঁদে বলিউডের তারকাদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২২ সালে ঠিক একই ব্র্যান্ডের (বিমল এলাইচি) বিজ্ঞাপনে শাহরুখ ও অজয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন অভিনেতা অক্ষয় কুমার।
ভক্তদের অসন্তোষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তোপের মুখে পড়ে অক্ষয় প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন। সে সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছিলেন:
“আমি আমার সব ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনাদের প্রতিক্রিয়া আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমি কখনো তামাকের প্রচার করিনি এবং করবও না… অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি এই চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসছি।”
তিনি আরও জানান, ওই বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত পুরো পারিশ্রমিক তিনি একটি জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে যেকোনো পণ্যের প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার আগে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার অঙ্গীকার করেছেন।
অক্ষয় কুমারের সেই বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে পুনরায় একই ব্র্যান্ডের ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপনে শাহরুখ, অজয় ও টাইগারের মতো তারকাদের যুক্ত হওয়া তাদের বাণিজ্যিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিল।
