ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » মা এক অলৌকিক রূপান্তর ও আমাদের দায়বদ্ধতার দর্পণ

মা এক অলৌকিক রূপান্তর ও আমাদের দায়বদ্ধতার দর্পণ

 

ফাবিহা তানজীম আঁচল:
প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ‘মা দিবস’ উঁকি দেয়, তখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয় কৃতজ্ঞতার আনুষ্ঠানিক উৎসব। একগুচ্ছ ফুল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সপ্রতিভ ছবি কি সেই মানুষটির ঋণের ভার লাঘব করতে পারে, যাঁর ত্যাগের খতিয়ান কোনো পার্থিব অংকে মেলে না? এক দিনের সাময়িক জোয়ারে কি ধারণ করা যায় জননীর আজীবনের ম্যারাথন সংগ্রামকে?

 

কন্যা থেকে জননী: এক মৌন রূপান্তরের আখ্যান
একজন নারী যখন কন্যা রূপে বেড়ে ওঠেন, তাঁর চোখে থাকে নিজস্ব আকাশ ছোঁয়ার রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু মাতৃত্বের পরশ লাগার সাথে সাথেই সেই স্বপ্নের মানচিত্র বদলে যায়; সেখানে নিজের সত্তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সন্তানের ভবিষ্যৎ। গর্ভধারণের সেই প্রথম মুহূর্তটি থেকেই শুরু হয় এক মহাজাগতিক ও নিঃশব্দ যুদ্ধ।

 

* শারীরিক ও মানসিক বিপ্লব: শরীরের প্রতিটি কোষে আমূল পরিবর্তন আর মনের অলিগলি জুড়ে চলা অদৃশ্য চাপ।
* সামাজিক শৃঙ্খল: মাতৃত্বকে ঘিরে সমাজের তৈরি করে দেওয়া পাহাড়সম প্রত্যাশার বোঝা।
নয় মাসের সেই সুদীর্ঘ পথচলা কেবল সময়ের হিসেব নয়; বরং তা সহনশীলতা, অন্তহীন ভয়, আর অদম্য ভালোবাসার এক অগ্নিপরীক্ষা।

 

মাতৃত্বের ত্যাগ: অদৃশ্য এক জীবনাহুতি

একজন মা তাঁর সত্তার কতটুকু বিসর্জন দেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা অসম্ভব। তবু জীবনের ক্যানভাসে সেই ত্যাগগুলো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে:
* স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারের বিসর্জন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের লালিত ক্যারিয়ার বা শখের জগতকে অবলীলায় তুচ্ছ করেন তিনি।
* বিশ্রামহীন প্রহর: নিজের শারীরিক ক্লান্তি বা অসুস্থতাকে আড়াল করে রাতের পর রাত সন্তানের শিয়রে জেগে থাকা।
* অব্যক্ত আর্তনাদ: গ্রামের অভাবী মা নিজের আহার কমিয়ে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন, আর শহরের কর্মজীবী মা অফিস ও সংসারের দ্বৈত ভার কাঁধে নিয়ে হাঁটেন এক নিঃসঙ্গ পথে।

 

সন্তানের প্রতিদান: ভালোবাসা নয়, শ্রদ্ধার অধিকার
মাতৃত্ব কেবল একপাক্ষিক বিলিয়ে দেওয়ার নাম নয়। মা আমাদের ছায়া দেন বলেই আমরা তাকে অবহেলা করতে পারি না। সন্তানের দায়িত্ব এখানে কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এক নৈতিক আবশ্যকতা:

* মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা এবং তাঁকে সময় দেওয়া।
* পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে তাঁর মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
* বার্ধক্যের গোধূলি বেলায় তাঁর হাতটি শক্ত করে ধরে রাখা।

 

মনে রাখতে হবে, মা কেবল কোনো যন্ত্র বা সেবাদাত্রী নন; তিনি রক্ত-মাংসে গড়া এক মানুষ, যাঁর নিজস্ব ক্লান্তি ও স্বপ্ন আছে।

আদর্শের পাঠশালা ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতা

মা-ই সন্তানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর আঁচলের তলাতেই সন্তান শেখে নৈতিকতা, মানবিকতা আর সহমর্মিতার আদি পাঠ। অথচ আমাদের সমাজ মাতৃত্বকে যতটা মহিমান্বিত করে, বাস্তবে ততটাই অবজ্ঞা করে:
* গৃহিণী মায়েদের হাড়ভাঙা খাটুনিকে ‘কাজ নয়’ বলে তুচ্ছ করা হয়।
* কর্মজীবী মায়েদের প্রতিনিয়ত দ্বিগুণ চাপের আগুনে পুড়তে হয়।
* এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ মায়েদের কপালে জোটে অবহেলা আর লাঞ্ছনা।

 

আগামীর অঙ্গীকার
মা দিবস কেবল একদিনের উৎসব নয়, এটি এক গভীর উপলব্ধির নাম। মাতৃত্ব কোনো অলংকার নয়, এটি এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। তাই আজ প্রশ্ন একটাই— আমরা কি কেবল যান্ত্রিকভাবে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে দায় সারব, নাকি তাঁর প্রাপ্য সামাজিক স্বীকৃতি ও হৃদয়ের গহীন থেকে আসা সম্মানটুকু ফিরিয়ে দিতে পারব?

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে