স্পোর্টস ডেস্ক: বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দিল এক অবিশ্বাস্য বীরত্বগাথা। হাতের আঙুল ভাঙা অবস্থাতেই পুরো ম্যাচ খেললেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। আর তাঁর সেই অদম্য লড়াইয়ে ৪৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উয়েফা ইউরোপা লিগের শিরোপা জিতল অ্যাস্টন ভিলা।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত ইউরোপা লিগের ফাইনালে জার্মান ক্লাব এসসি ফ্রেইবার্গ-কে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ইতিহাস গড়ে ইংলিশ ক্লাবটি। তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক আহত যোদ্ধার গল্প—‘দিবু’ মার্তিনেজের অসাধারণ আত্মত্যাগ।
ফাইনালের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। কিকঅফের ঠিক আগে ওয়ার্মআপে বল ধরতে গিয়ে মারাত্মক চোট পান মার্তিনেজ। একটি কঠিন শট ঠেকাতে গিয়ে তাঁর হাতের আঙুল ভেঙে যায়। মুহূর্তেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে অ্যাস্টন ভিলা শিবিরে।

ম্যাচ শেষে ইএসপিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মার্তিনেজ বলেন,
“আজ আমরা যা অর্জন করেছি, সেটা সত্যিই অসাধারণ। ওয়ার্মআপেই আমার আঙুল ভেঙে যায়। জীবনে আগে এমন হয়নি। বল ধরতে গেলেই আঙুলটা উল্টো দিকে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি এটাকে অজুহাত বানাতে চাইনি। ফুটবলারদের ক্যারিয়ারে এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হয়।”
চোট পাওয়ার পর কিছু সময় মাঠের বাইরে চিকিৎসা নেন তিনি। চিকিৎসকরা তাঁকে বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও, এমন ঐতিহাসিক ফাইনাল বেঞ্চে বসে দেখার মানসিকতা ছিল না আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপজয়ী এই গোলরক্ষকের। শক্ত ব্যান্ডেজে আঙুল বেঁধেই আবার মাঠে ফিরে আসেন তিনি।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে অ্যাস্টন ভিলা। কোচ উনাই এমেরি-র কৌশলী পরিকল্পনায় ফ্রাইবুর্গকে একপ্রকার কোণঠাসা করে ফেলে ইংলিশ দলটি।
প্রথমার্ধেই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয় ভিলা। এরপর একে একে গোল করেন ইউরি টাইলেম্যানস, এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, মরগান রজার্স। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-০।
অন্যদিকে গোলপোস্টের নিচে ব্যথা চেপে রেখে অসাধারণ দৃঢ়তায় খেলতে থাকেন মার্তিনেজ। ফ্রাইবুর্গের অন্তত দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ দুর্দান্ত সেভে ফিরিয়ে দেন তিনি। তাঁর সেই অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় ক্লিনশিট নিয়েই ম্যাচ শেষ করে অ্যাস্টন ভিলা।
এই জয়ের মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ইউরোপিয়ান কাপের পর প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় মঞ্চে বড় কোনো শিরোপা জিতল ভিলা। একই সঙ্গে দীর্ঘ ৪৪ বছরের শিরোপা-খরাও কাটল ক্লাবটির।
এই শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজের আধিপত্য আরও একবার প্রমাণ করলেন উনাই এমেরি। স্প্যানিশ এই কোচ ম্যানেজার হিসেবে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো উয়েফা ইউরোপা লিগ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করলেন।
এর আগে সেভিয়া এফসি -কে তিনবার এবং ভিয়ারিয়াল সিএফ-কে একবার ইউরোপা লিগ জিতিয়েছিলেন এমেরি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো অ্যাস্টন ভিলার নামও।

এই জয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারে বড় ফাইনালগুলোতে শতভাগ সাফল্যের অনন্য রেকর্ডও ধরে রাখলেন মার্তিনেজ। এর আগে তিনি জিতেছেন ফিফা বিশ্বকাপ কাতার 2022, কোপা আমেরিকা 2021, ফাইনালিসিমা 2022 এবং ইংল্যান্ডের এফএ কাপের ফাইনাল।
প্রতিবারই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তাই অনেক ভক্তই এখন তাঁকে ‘ফাইনালের বাজপাখি’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে এই চোট এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল-এর জন্য। আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার গোলবার সামলানোর সবচেয়ে বড় ভরসা মার্তিনেজকে নিয়ে তাই শঙ্কায় ভক্তরা।
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ জর্ডান, আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া। কঠিন এই মিশনের আগে মার্তিনেজের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তিনি নিজে রয়েছেন আত্মবিশ্বাসী।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন,
“ইউরোপা জিতে আমি ভীষণ খুশি। এই দলটা অনেক দিন এমন আনন্দ পায়নি। এখন সতীর্থ ও সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপনের সময়। আর চোট নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। এখন আমার পুরো মনোযোগ বিশ্বকাপের দিকে। আমি প্রস্তুত থাকব।
ফাইনালের গ্যালারিতেও ছিল রাজকীয় আবহ। অ্যাস্টন ভিলার দীর্ঘদিনের সমর্থক প্রিন্স উইলিয়াম স্বশরীরে স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে দলের ঐতিহাসিক জয় উপভোগ করেন। ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্তিনেজ ও পুরো দলকে অভিনন্দনও জানান তিনি।
একদিকে ভাঙা আঙুলের যন্ত্রণা, অন্যদিকে ইতিহাস গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের মিশেলে ইস্তাম্বুলের রাতটি এখন অ্যাস্টন ভিলা সমর্থকদের কাছে রূপ নিয়েছে এক মহাকাব্যিক স্মৃতিতে।
