নবপ্রকাশ ডেস্ক:
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও গণভোট গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আশাকে টেকসই করেছে। নির্বাচনের পরিবেশ ছিল সাধারণভাবে শান্ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দৃশ্যমান কার্যকর পরিকল্পনার এই কৃতিত্ব বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের। তারা ঝুঁকিভিত্তিক নিরাপত্তা রক্ষাকারী মোতায়েন করেছে। স্বচ্ছতার পরিমাপগুলো ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে আছে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান। এসব উদ্যোগ নির্বাচনের দিন জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আনফ্রেল (এএনএফআরইএল)। নির্বাচনে ছোটখাট কিছু ত্রুটির কথাও তারা তুলে ধরেছে। চূড়ান্ত রিপোর্টে তারা বলেছে, একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জনগণের জন্য তথ্য প্রবাহের মৌলিক নিয়ম নির্ধারণ করে দেয় আইনগত কাঠামো।
প্রচারণার সময়কাল, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের আচরণবিধি এবং গণমাধ্যম কাভারেজ-সংক্রান্ত বিধানসমূহ ভোটারদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করে। তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব সুরক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করেছে এর ধারাবাহিক ও কার্যকর প্রয়োগের ওপর। এর মধ্যে রিপোর্টকৃত নিয়ম লঙ্ঘনের সময়মতো নিষ্পত্তিও অন্তর্ভুক্ত। তথাপি মিশনের চূড়ান্ত মূল্যায়নে ভোটগ্রহণের সুশৃংখল পরিচালনার পাশাপাশি ধারাবাহিক সততার চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তা হলো নির্বাচনী জবাবদিহিতা। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনায় দেখা গেছে, নির্বাচনী নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি কার্যকর হবে- এমন আস্থা সীমিত ছিল। বিশেষ করে অর্থনির্ভর রাজনীতি ও প্রচারণা ব্যয়ের ক্ষেত্রে। অংশীজনরা বার বার প্রচারণায় উচ্চ ব্যয় ও অনানুষ্ঠানিক খরচের কথা বলেছেন। আর আইন প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে অসম ও কিছু ক্ষেত্রে অবাস্তব বলে মনে করা হয়েছে। সিভিল সোসাইটির পর্যবেক্ষণেও প্রার্থীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, প্রচারণা সময় শেষ হওয়ার আগেই অর্থ খরচ করা হয়েছে।
পোস্টার ও তারপুলিন নিয়ন্ত্রণের মতো দৃশ্যমান কিন্তু অসমভাবে প্রয়োগ হওয়া কিছু বিধানও নির্বাচন কমিশনের নিয়ম প্রয়োগ ক্ষমতা নিয়ে আস্থাকে দুর্বল করেছে।
নির্বাচন দিবসে আনফ্রেল একটি বাস্তব ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। তা সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া সত্ত্বেও অবাধ পছন্দের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তা হলো অর্থনির্ভর রাজনীতি। ভোটকেন্দ্রের কাছে দল পরিচালিত ভোটার শনাক্তকরণ ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা হচ্ছিল। কখনও কখনও তাতে দলের লোগো ও প্রার্থীর ছবি ছিল। পর্যবেক্ষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে, কিছু ভোটার এই স্লিপ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সময় পোলিং এজেন্টদের দেখাচ্ছিলেন। এই প্রক্রিয়াটি উদ্বেগজনক। কারণ এটি ভোট কেনাবেচা বা প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থার যাচাইকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে অনুচিত প্রভাবের ঝুঁকি বাড়ে।
একইভাবে, নিরাপত্তা পরিবেশ নির্বাচন-পূর্ব উত্তেজনা এবং নির্বাচন দিবসের শৃঙ্খলার মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শন করেছে। অংশীজনরা নির্বাচনপূর্ব ও প্রচারণা সময়কে ‘মাসল পাওয়ার’-সংক্রান্ত ভয়ভীতি ও সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর মধ্যে স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। নির্বাচন দিবসে পর্যবেক্ষণ করা অনেক এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত ছিল, যা নির্দেশ করে যে পরিকল্পনা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক বিঘ্ন হ্রাসে কার্যকর ছিল। তবে এই অর্জনের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে নথিবদ্ধ করা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর।
আনফ্রেল-এর নির্বাচন দিবসের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে যে, পর্যবেক্ষণ করা এলাকাগুলোতে ভোটদান ও গণনা সাধারণত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা সাধারণত উপস্থিত ছিলেন। গণনার সময় কিছু স্থানে ব্যালট বাক্স খোলার সময় গুরুত্বপূর্ণ যাচাইকরণ ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও একরূপ ছিল না। যদিও এই প্রক্রিয়াগত ঘাটতিগুলো পর্যবেক্ষণ করা এলাকায় ফলাফল পরিবর্তন করেছে এমন প্রমাণ নয়, তবে এগুলো যাচাইযোগ্যতা কমিয়ে দিয়েছে এবং বিশেষ করে ঘন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ফলাফলও মিশ্র ছিল। ভোটার তালিকায় নারী ও পুরুষের প্রায় সমতা দেখা গেছে। তরুণদের অংশগ্রহণ নির্বাচনে একটি দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে প্রথমবার ভোটদাতাদের মধ্যে ও রাজনৈতিক সংগঠনে সেটা ছিল। তবে নারী প্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল। অনেক দলই কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিছু এলাকায় ভয় ও বঞ্চনার কথা জানিয়েছে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ-সংক্রান্ত বড় বাধার মুখে পড়েছেন। লিঙ্গ বৈচিত্র্যপূর্ণ অংশগ্রহণ ভোটার নিবন্ধনের মাধ্যমে অগ্রগতি পেলেও প্রতিনিধিত্ব সীমিত ছিল এবং কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সমস্যা রয়ে গেছে।
একই সময়ে তথ্য পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও বর্ণনা প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, নাগরিক তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক বার্তার মতো গণতান্ত্রিক কনটেন্ট সাধারণত প্রভাবশালী ছিল, যা হেরফের, চাপ প্রয়োগ এবং বৈধতা ক্ষুণ্ণকারী বার্তার তুলনায় বেশি ছিল। তবে ভোট কেনাবেচা, অনিয়ম, ভয়ভীতি, যার মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বিভ্রান্তিকর তথ্য অন্তর্ভুক্ত এবং নির্বাচন দিবসের কাছাকাছি সময়ে আরও জটিল হেরফেরমূলক বার্তা- এসব বারবার দেখা গেছে। যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া সমন্বয় এবং সরকারি সক্রিয় যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি অংশীজনদের কাছে আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের পাশাপাশি অর্থায়িত কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমোদনও নিতে হয়েছে। ভোটগ্রহণের অল্প সময় আগে পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র দেয়া হয়েছে। ফলে ভোটার নিবন্ধন, প্রচারণা ও বিরোধ নিষ্পত্তির পর্যায়গুলোতে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম মূলত নির্বাচন দিবসেই সীমিত ছিল এবং পুরো নির্বাচনী চক্রের প্রাক-নির্বাচনী, নির্বাচন দিবস ও পরবর্তী পর্যায়গুলো পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত ছিল। সময়মতো অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করা, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষণকে স্বীকৃতি দেয়া এবং পুরো নির্বাচনী চক্র জুড়ে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জন-তদারকি শক্তিশালী করবে, নিয়ম লঙ্ঘন প্রতিরোধ করবে এবং আস্থা বৃদ্ধি করবে।
আওয়ামী লীগের স্থগিতাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে ধারণাকে প্রভাবিত করতে থাকে এবং গণভোটের ফলাফল জুলাই চার্টারের অধীনে সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়নের প্রত্যাশা বাড়ায়। আনফ্রেল-এর মূল্যায়ন ছিল যে, বাংলাদেশের নির্বাচন দিবসের আস্থা অর্জন তখনই টেকসই হবে যদি নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা পুনর্মিলনমুখী একটি ট্রানজিশনাল জাস্টিস প্রক্রিয়ার ওপর কেন্দ্রিভূত হয়, যা আইনের ভিত্তিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। এর মধ্যে থাকবে কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রচারণা ব্যয় তদারকি, স্পষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং পৃষ্ঠপোষকতা, ভয়ভীতি ও পুনরাবৃত্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা কমানোর সংস্কার উদ্যোগ।
