জহিরুল ইসলাম রাতুল: ‘ভাইয়া, আপনার ফোনটা একটু দেওয়া যাবে? আমার ফোন হারিয়ে গিয়েছে বা ব্যালেন্স নেই। বাসায় জরুরি ফোন দিতে হবে।’
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে এমন স্বাভাবিক ও মানবিক একটি অনুরোধে অনেকেই হয়তো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু এই সামান্য অসতর্কতাই কখনো কখনো ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীতে অল্পবয়সী তরুণীদের সামনে রেখে এমনই অভিনব কৌশলে তরুণদের ফাঁদে ফেলছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় চক্রটির কর্মকাণ্ডের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে প্রথমে একজন তরুণী সাহায্যের আবেদন করে মোবাইল ফোন নেয়। এরপর ফোনে কথা বলার অজুহাতে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় নির্দিষ্ট একটি স্থানে। আর সেখানে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি। অভিযোগ রয়েছে, ওই স্থানে আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকে আরও কয়েকজন তরুণী। ফোন নেওয়া তরুণীর সঙ্গে ভুক্তভোগীকে দেখে তারা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠার অভিনয় করে। এরপর উল্টো ওই তরুণকেই অভিযুক্ত করে নানা কথা বলতে শুরু করে। কেউ বলতে থাকে, ‘তুমি মিথ্যা কথা বলে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছ।’ আবার কেউ অভিযোগ করতে পারে, তাকে হোটেলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় ভুক্তভোগীর নিজের মোবাইল ফোনটিকেই ‘প্রমাণ’ হিসেবে দেখানো হয়। এরপর শুরু হয় ভয়ভীতি প্রদর্শন। অভিযোগ অনুযায়ী, তরুণী সদস্যরা ভুক্তভোগীকে হুমকি দেয়—তাদের কথা না শুনলে চিৎকার করে আশপাশের লোকজন জড়ো করা হবে। সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। ভুক্তভোগী প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির হয় চক্রটির পুরুষ সদস্যরা। তরুণীরা তাদের কাছে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ‘বিচার’ চায়। এরপর শুরু হয় চাপ, ভয়ভীতি এমনকি মারধরের অভিযোগও রয়েছে। ‘মান-সম্মান বাঁচাতে’ সর্বস্ব দেওয়ার অভিযোগ
চক্রটির মূল কৌশলই হচ্ছে ভয় ও সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কাকে কাজে লাগানো—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে নেওয়া হয়। কারও কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে পরিবারের সদস্য বা পরিচিতজনের কাছ থেকে বিকাশে টাকা আনতেও বাধ্য করা হতে পারে।
অনেকেই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার জন্য চক্রের দাবি মেনে নেন বলে অভিযোগ। কারণ প্রকাশ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি হলে কিংবা মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চক্রটির কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অল্পবয়সী তরুণীদের ব্যবহার। পরিচ্ছন্ন পোশাক, স্মার্ট আচরণ এবং স্বাভাবিক কথাবার্তার কারণে প্রথম দেখায় তাদের সন্দেহ করার মতো কোনো কারণ থাকে না। বরং বিপদে পড়া একজন তরুণী হিসেবে তাদের দেখে অনেকেই সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন। আর সেই বিশ্বাসই হয়ে ওঠে চক্রটির প্রধান অস্ত্র। একজন তরুণী যখন ‘ভাইয়া’ কিংবা ‘আংকেল’ বলে সাহায্য চান, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মানবিক কারণে সহযোগিতা করতে চান। কিন্তু মোবাইল ফোনটি হাতে পাওয়ার পরই ওই তরুণী নির্দিষ্ট স্থানের দিকে চলে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে অভিযোগ।
সম্প্রতি রাজধানীতে এ ধরনের একটি চক্রকে পুলিশ আটক করেছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির সদস্যদের বয়স তুলনামূলক কম হওয়ায় তাদের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগের কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট থানা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর পাশাপাশি এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে অপরিচিত কেউ ফোনে কথা বলার জন্য মোবাইল চাইলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে নিজের হাতে ফোন রেখে নম্বরটি ডায়াল করে দেওয়া যেতে পারে। তবে অপরিচিত কাউকে ফোন হাতে দিয়ে তার সঙ্গে নির্জন বা অপরিচিত স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কেউ মোবাইল নেওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে দূরে চলে গেলে তার পিছু নিয়ে একা কোনো স্থানে না যাওয়াই নিরাপদ। বরং বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে আশপাশের নিরাপদ স্থান, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। আর কেউ যদি দলবদ্ধভাবে ঘিরে ধরে ভয়ভীতি দেখায়, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে একা কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত নিরাপদ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সরে যাওয়া জরুরি। রাজধানীতে অপরিচিত মানুষের প্রতি মানবিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সহযোগিতা যেন কারও জন্য প্রতারণার ফাঁদে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকাও জরুরি।
সতর্ক থাকুন—অপরিচিত কাউকে পরিস্থিতি না বুঝে নিজের মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেবেন না।
