ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » দাগী দস্যুর সঙ্গে ভয়ংকর ২৪ ঘন্টা 

দাগী দস্যুর সঙ্গে ভয়ংকর ২৪ ঘন্টা 

আমিরুল ইসলাম কাগজী।।
“বাবা, আজ তুমি কারাগারে চার দেয়ালে বন্দি হয়েছ একজন ছিনতাইকারী হিসেবে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে মোবাইলফোন আর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের অভিযোগে। বাবা, কোর্টের জজ সাহেবরাও কি বিশ্বাস করছেন এই অভিযোগ? কেন তোমাকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন মঞ্জুর করলেন বিচারক? দেশে কি বিচার বলতে কিছু নেই?” তানজিদা খুব আবেগ দিয়ে লিখেছে কথা গুলো।বাবার উদ্দেশে লেখা কন্যার চিঠিটির মধ্যে আবেগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে নানা অসন্তোষ । ২০১০ সালের মধ্য জুনে ‘বাবার কাছে খোলা চিঠি’ শিরোনামে একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকায় কলম ধরেছিল তানজিদা নাহার হক। ওই সময়ের স্কুলছাত্রী তানজিদা বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একমাত্র কন্যা। ঠিক এর পরপরই সাপ্তাহিক একটি ম্যাগাজিনের কভার স্টোরি হয়েছিল ১২৭৯ বছর জেল হতে পারে মিলনের!
ভাবতে থাকি। এহছানুল হক মিলন। বিএনপি সরকারের সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। নকল বন্ধ করে আলোড়ন ফেলেছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি পর্যায়ে নকল বন্ধের সুচনা সেই থেকে। এ কৃতিত্বের অনেকটা তার পাওনা। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে এহছানুল হক মিলন চাঁদপুরের কচুয়া থেকে ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে হারিয়ে নির্বাচনে চমক দিয়েছিলেন। বেগম জিয়া তার পুরস্কার দেন মিলনকে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে।
১১ অক্টোবরের ২০০১ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ছিলেন মিডিয়ায় সরব। তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের প্রচারণা ছিল ব্যাপক। নকল বন্ধে প্রতিমন্ত্রীর এসব কাজকর্ম সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। পড়ার টেবিলে ফিরে আসে শিক্ষার্থীরা। সবাই বেশ উৎসাহী হয়ে ওঠেন প্রতিমন্ত্রীর এ কাজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেট মিলন, আমেরিকার নাগরিকত্ব ছাড়তে বাধ্য হন রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব বজায় রাখতে।
২০০১-২০০৬ বিএনপি সরকারের আমলের সবচেয়ে সরব প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে মোবাইল ছিনতাইয়ের মামলা, ঘড়ি চুরির মামলা- সব মিলিয়ে ৩ ডজন মানে ৩৬টি মামলার পুরস্কার জুটেছে মিলনের ভাগ্যে। পুরস্কারই বটে! কেননা একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা!
৩৬টি মামলার মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, লুটতরাজ এবং ধর্ষণ বিষয়ে। ছিনতাইয়ের বিষয়গুলোও কৌতূহলোদ্দীপক। ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই, স্বর্ণের নেকলেস, মোবাইল সেট, স্বর্ণের চেইন, সিকোফাইভ ঘড়ি ছিনতাই, মোটরসাইকেল, নগদ টাকা, ২১ ইঞ্চি টেলিভিশন, আংটি ইত্যাদি ছিনতাইয়ের অভিযোগে মিলনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৭০ বছর বয়সী এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পৌর ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে সদস্যরা এ মামলার বাদী।
একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, যিনি দীর্ঘদিন আমেরিকা প্রবাসী, যার পরিবারের অনেক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য বসবাস করেন, যিনি অত্যন্ত সচ্ছল জীবনযাপন করেছেন, তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা পাতি নেতাদের কাছ থেকে স্বর্ণের নেকলেস ছিনতাই করেছেন, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টাকা ছিনতাই করেছেন- এ কথাটি কি বিশ্বাসযোগ্য? শুনতে খারাপ লাগলেও আদালত কিন্তু ঠিকই বিশ্বাস করেছে এই সব অভিযোগ এবং এর জন্য তাকে বারবার রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।আমাদের রাষ্ট্র, পুলিশ, বিচারালয় এই মামলা দায়ের করেছে, তদন্ত করেছে, তার বিচারও করেছে।
শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মেধাবী মিলন। হেয়প্রতিপন্ন করার নিরন্তর চেষ্টা করা হয়েছে পরিবারকে। এমনিভাবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচ্ছন্ন ব্যাক্তিত্বের অধিকারী মিলন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কবলে আটকা পড়ছেন, তখন বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই হয়তো উচ্চ আদালতের বিচারকগণ তার প্রতি সদয় হয়েছেন। বারবার জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। আদালতের বারবার জামিন আদেশের পরও মিলন যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না, বন্দিত্বের শেকল খুলছে না, প্রকৃতিপ্রেমী মিলন যখন সকালের সূর্যোদয় আর বিকেলের সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারছেন না, তখন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েই হয়তো হাইকোর্টের বিচারকগণ ২৪তম মামলায় ২০১০ সালের ২৫ জুন এক আদেশে বলেছেন, ‘নতুন আর কোন মামলায় মিলনকে গ্রেফতার, স্যোনএরেস্ট ও রিমান্ডে নেয়া যাবে না’। মিলনের আকুলতা হয়তো মান্যবর বিচারকগণের হৃদয়ে আঁচড় কাটতে পেরেছে। ফলে এমন এক ঐতিহাসিক আদেশ দিয়েছেন বিচারকগণ। আর এ আদেশের পরই কারা প্রকোষ্ট থেকে মুক্তিলাভ করেন বন্দি মিলন। তিনি অর্জণ করেন কারাভোগ ও নির্যাতনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। এ নির্মম পাষবিকতার বিচারের রায় হয়তো আর কোন আদালত দেবেন না। তবে এটাও ঠিক গণমানুষের বিবেকের আদালতের রায় মিলনের পক্ষেই যাবে, নিশ্চিত। কারন, সত্যকে দীর্ঘ দিন ঢেকে রাখা যায় না বলেই ইতিহাসকেও বিকৃত করা যায়না।
দেশের রাজনীতিতে পরিছন্ন ও জনপ্রিয় রাজনীতিক আ.ন.ম এহছানুল হক মিলন। গত জোট সরকারের সময়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার সাধনে কঠোর ভূমিকা রাখেন। অভিশপ্ত নকল প্রথা নিরসনে তার নেয়া ঐতিহাসিক উদ্যোগ সারাদেশেই প্রসংশিত হয়। তার নির্বাচনী এলাকায় দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের নিশ্চিত নিরাপত্তা দিয়েছেন মিলন। কেউ যাতে কোন প্রকার নির্যাতন-নিপিড়ণের শিকার না হয় এ জন্য প্রতিনিয়ত খোঁজ-খবর রেখেছেন। অসহায় দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কল্যানে নিবেদিত প্রাণ তিনি। ফলে চরম দুঃসময়েও জনগণের সহানুভূতি ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন মিলন।

১/১১ এর তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বহুল আলোচিত-সমালোচিত যৌথ-বাহিনী পরিচালিত দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়ে দেশের প্রধান দু’টি দলের শীর্ষ সারির অনেক নেতা কারাবরণ করেছেন। গ্রেফতার এড়াতে অনেকে আত্মগোপন করেছেন, অনেকে পালিয়ে গিয়েছেন বিদেশ। গণতন্ত্রের ওই ক্রান্তিকালেও এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে দূর্নীতির কোনরকম অভিযোগ উঠেনি । তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর মিলনের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন এবং তাকে মানসিকভাবে নাজেহাল-হয়রানি করতে উঠেপড়ে লাগে শাসক দলের বিতর্কিত নেতা ঘাগু আমলা মখা আলমগীর। পাতানো ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা অনুযায়ী মিলনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আজগুবি ও লজ্জাকর অভিযোগে মামলা। অনেক মামলার অভিযোগ থেকে তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীকেও বাদ দেয়া হয়নি। গত জোট সরকার সময়ের ঘটনা দেখিয়ে একে একে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয় মিলনের বিরুদ্ধে। আর এভাবেই পরিকল্পিত মামলার জালে আটকা পড়ে প্রথম কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হন মিলন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাতানো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী মখা আলমগীর ১ লাখ ৭ হাজার ৪৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দি এহছানুল হক মিলন ৮০ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে ছিলেন। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১৫ জুলাই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ থেকে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই রায়ের প্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন চাঁদপুর-১ সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণায় গেজেট প্রকাশ করে। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মহীউদ্দীন খান আলমগীর হাইকোর্টে রিট করেন। ফলে নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত গেজেটের কার্যকারিতা ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিত হয়ে পড়ে। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বিশেষ করে বিচারক মানিকের মত এক চোখা দৈত্যের হাত ধরে এক বিশাল বেআইনি আদেশ আদায়ের মাধ্যমে ম খা আলমগীর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পুরো পাঁচ বছর।
কি ভয়ঙ্কর ছিল সেই দিনগুলো । প্রতিহিংসাপরায়ণ ম খা আলমগীর সাবেক এই সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মিলনকে হত্যার ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকেন প্রতিনিয়ত। রাতের আঁধারে একজন ভয়ঙ্কর দস্যুর মত মিলনকে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে নেওয়া হতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই তাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু কথায় বলে, “রাখে আল্লাহ মারে কে।” এখন বলতে হয় সেই ম খা আলমগীর আজ কোথায়? আর মিলনের অবস্থান কোথায়?
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এহছানুল হক মিলন এবার স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার। তার সেই স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ব হওয়ার জন্য আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে তার যে মিশন এবং ভিশন সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্য সফরসঙ্গী হয়েছিলাম বরিশাল, খুলনা এবং দিনাজপুর বোর্ডের মতবিনিময় সভায়। প্রতিটি সভায় তিনি শিক্ষকদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, বলেছেন; শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে শিক্ষার্থীদের আনতে হবে পড়ার টেবিলে। শতভাগ শিশুকে নিয়ে আসতে হবে শিক্ষার স্বপ্নজালে। একটি শিশুও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকবে না। তাদের বিদ্যালয় গুলো ভরিয়ে তুলতে হবে স্বপ্নের বেড়াজালে। যেখানে একটি শিশু প্রবেশ করলে আর বাড়ি ফেরার কথা মনে করবে না। বিদ্যালয় হয়ে উঠবে তার আপন ঘর। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট এর কথা মাথায় রেখে তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন একটি দক্ষ জনশক্তির দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ শে ডিসেম্বর ঢাকায় পদার্পণ করে বলেছিলেন “আই হ্যাভ আ প্লান”। তার সেই প্লান সবার আগে বাংলাদেশ। গড়তে হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তার সেই দেশ গড়ার সহযাত্রী হিসেবে দক্ষ কারিগর হিসেবে সবার সামনে আছেন শিক্ষামন্ত্রী মিলন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বলেন,”Our progress as a nation can be no swifter than our progress in education.”
অর্থাৎ শিক্ষায় অগ্রগতির চেয়ে দ্রুত কোনো জাতির অগ্রগতি হতে পারে না।”
সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রনয়ন করা হয়েছে বাজেট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা খাতে। এর সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে, আমরা পাব একটি সুসংগঠিত সুদক্ষ সুশিক্ষিত জাতি।

০০০০

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে