নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি এবং ‘ঢাকা দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মাসব্যাপী ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবে শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘ঢাকা হেরিটেজ রান’। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন নাগরিকদের সামনে তুলে ধরে শহরের প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতেই এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়।
সকাল ৭টায় মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া হেরিটেজ রানের উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
শনিবার ১৫ আগষ্ট সকালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই হেরিটেজ রানে এক হাজারেরও বেশি নাগরিক অংশ নেন। রানের পথ ছিল মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে কাকরাইল, রমনা, শাহবাগ, কাটাবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পলাশী, লালবাগ কেল্লা, শহিদনগর হয়ে সোয়ারিঘাট লঞ্চঘাট পর্যন্ত। কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক রানারকে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে পদক ও সনদ প্রদান করা হয়।
ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার প্রত্যয়
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে খেলাধুলার পাশাপাশি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগ আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তুলবে এবং শহরের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের আগ্রহ বাড়াবে।”
‘আমার ঢাকা, আমার দায়িত্ব’
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, হেরিটেজ রানের মূল উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের নিজেদের শহরকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেওয়া।
তিনি বলেন, “আজকের রানে অংশ নিয়ে আপনারা ঢাকার বাস্তব চিত্র দেখেছেন—কোথাও ভালো রাস্তা, কোথাও ভাঙাচোরা, কোথাও বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত। এই বাস্তবতার মধ্যেই নগরবাসীর জীবনযাত্রা আরও সুন্দর করতে হবে।”
তিনি পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। নগরবাসী যত্রতত্র ময়লা না ফেললে এবং ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা সহযোগিতা করলে ঢাকাকে আরও সুন্দর রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দায়িত্বশীলভাবে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।”
পুরান ঢাকায় পর্যটন ও সাইকেল লেনের পরিকল্পনা
প্রশাসক জানান, এটি প্রথম আয়োজন হওয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। ভবিষ্যতে ভুলত্রুটি সংশোধন করে প্রতিবছরই এ ধরনের আয়োজন করা হবে।
তিনি আরও জানান, পুরান ঢাকাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সাইকেল চালানোর জন্য আলাদা লেন এবং হাঁটা ও দৌড়ের উপযোগী পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তার ভাষায়, “আমার দায়িত্ব আমি পালন করব, আপনার দায়িত্ব আপনি পালন করবেন। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে এই ঢাকা শহর আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।”
মাসজুড়ে ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসব
ডিএসসিসির উদ্যোগে ১ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসব। এর মধ্যে রয়েছে—
১৬–২২ আগস্ট: জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ঢাকাভিত্তিক নাট্যোৎসব
২১ আগস্ট: খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
২১ আগস্ট: সদরঘাট থেকে শতবর্ষী হেরিটেজ ক্রুজ ভ্রমণ
২২ আগস্ট: মধুমিতা সিনেমা হলে পুরোনো ঢাকাকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
২১–৩০ আগস্ট: ‘দ্য গ্রেট ঢাকা সেল’ এবং ‘লাভ লেটার টু ঢাকা’ কর্মসূচি
২১–২৮ আগস্ট: শিল্পকলা একাডেমিতে ঢাকাভিত্তিক নাট্যোৎসব
২৩–২৯ আগস্ট: বিটিভিতে ঢাকার পুরোনো নাটক ও বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার
২৪ আগস্ট: উত্তর ধানমন্ডি থেকে হেলিকপ্টারে ‘পাখির চোখে হৃদয়ে ঢাকা’ প্রদর্শন
২৮ আগস্ট: লক্ষ্মীবাজার থেকে নগর ভবন পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, ভিনটেজ গাড়ি ও পালকিসহ শোভাযাত্রা
২৯ আগস্ট: লালবাগ কেল্লায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ কর্মসূচির সূচনা
৩০ আগস্ট: লালবাগ কেল্লায় ঘুড়ি উৎসব, ‘ঢাকা আড্ডা’ ও কাওয়ালি
১ সেপ্টেম্বর: শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ ও উন্মুক্ত আর্ট ক্যাম্প
৫ সেপ্টেম্বর: আলমগঞ্জ জেটিতে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েতি আড্ডা
নাগরিকদের অংশগ্রহণের আহ্বান
ডিএসসিসি জানিয়েছে, রাজধানীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে নতুনভাবে উদযাপনের লক্ষ্যেই ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও উৎসব, গর্ব ও দায়িত্বের এই আয়োজনে সব শ্রেণি-পেশার নাগরিককে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
