স্পোর্টস ডেস্ক:
একসময় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় পাওয়াটা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য ছিল একপ্রকার নিয়মিত বিষয়। দেশের মাটিতে হোক কিংবা জিম্বাবুয়ের মাটিতে—তাদের বিপক্ষে টানা ১৯টি ওয়ানডে জেতার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিল টাইগাররা। তবে সময়ের চাকা ঘুরেছে, আর বদলে গেছে ক্রিকেটের সেই চিরচেনা সমীকরণও। বাংলাদেশ দল একসময় যাকে সহজ প্রতিপক্ষ ভাবত, সেই জিম্বাবুয়ে দল এখন অতীতকে পেছনে ফেলে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ দুই সিরিজে বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে আফ্রিকান দেশটির ক্রিকেট এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর অপেক্ষায়।
জিম্বাবুয়ের এই পুনরুত্থান এবং নতুন রূপ ধারণের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে দলটির তরুণ ও উদীয়মান প্রজন্ম। বিশেষ করে ব্যাটিং অর্ডারে দুই ওপেনার ব্রায়ান বেনেট ও বেন কারেনের অন্তর্ভুক্তি দলটির শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অভিজ্ঞ সিকান্দার রাজা, ব্রেন্ডন টেলর, ক্রেইগ আরভিন, রিচার্ড এনগ্রাভা ও ব্লেসিং মুজারাবানিদের সঙ্গে এই তরুণদের সংযুক্তি জিম্বাবুয়ে শিবিরকে করে তুলেছে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ ও ভয়ংকর।
দলের ব্যাটিং অর্ডারে নতুন প্রাণশক্তি জোগানো বেন কারেন মূলত এক জমজমাট ক্রিকেট পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা কেভিন কারেন ছিলেন আশির দশকে জিম্বাবুয়েকে বিশ্বমঞ্চে তুলে আনার অন্যতম সেনানী। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে নিজের আসল সামর্থ্য ও দক্ষতা প্রমাণ করেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন বেন। তাঁর দুই ভাই স্যাম কারেন ও টম কারেন ইংল্যান্ডের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাতালেও, ৩০ বছর বয়সী বাঁহাতি এই ওপেনার বেছে নিয়েছেন নিজের পিতৃভূমি জিম্বাবুয়েকেই। গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকেই জিম্বাবুয়ে ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন তিনি। বিশেষ করে গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাঁর অনবদ্য সেঞ্চুরিই জিম্বাবুয়েকে লড়াকু পুঁজি এনে দিয়েছিল।
বেন কারেনের সঙ্গী হয়ে ওপেনিংয়ে ঝড় তোলা ব্রায়ান বেনেটের বয়স মাত্র ২২ বছর। জিম্বাবুয়ের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের ধাপ পেরিয়ে জাতীয় দলে আসা এই মারমুখী তরুণ ওপেনার নিজ দায়িত্বে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি জিম্বাবুয়ের বোলিং বিভাগেও যোগ হয়েছে নতুন অস্ত্র। দলের অন্যতম প্রধান ‘ম্যাচ উইনার’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ২৯ বছর বয়সী পেস বোলিং অলরাউন্ডার ব্রাড ইভান্স। গতির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দলের প্রয়োজনে লোয়ার অর্ডারে ব্যাট হাতেও ঝড় তুলতে পারেন তিনি। পাঁচ বছরের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বেশ কিছু স্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। যার মধ্যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৩ রানে ৩ উইকেট, ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৫ উইকেট এবং টেস্টে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট শিকারের অনন্য কীর্তি উল্লেখযোগ্য। তাঁর পিতা ক্রেইগ ইভান্সও অতীতে জিম্বাবুয়ের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা ও ক্রীড়াজগতে হাতেখড়ি হওয়া ব্রাড হকি, রাগবি ও জ্যাভেলিনের মতো ডিসিপ্লিনেও দক্ষ ছিলেন, তবে পড়াশোনা শেষ করে নিজের মূল ভালোবাসা হিসেবে ক্রিকেটকেই বেছে নেন তিনি।
এছাড়াও জিম্বাবুয়ে দলের আরেকটি বড় চমক বা সারপ্রাইজ প্যাকেজ হলো ২০ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার নিউম্যান তাকুদজওয়া নিয়ামহুরি। বোলিংয়ের পাশাপাশি লোয়ার অর্ডারে কার্যকর ব্যাটিং করতে পারদর্শী এই তরুণ গত জুলাইয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দেখিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন।
আজ থেকে শুরু হওয়া ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজেও এই নতুন প্রজন্মের তারুণ্যদীপ্ত পারফরম্যান্সই হতে যাচ্ছে জিম্বাবুয়ে দলের মূল প্রেরণা ও শক্তির উৎস। অতীতের সেই ১৯ ম্যাচ জয়ের পরিসংখ্যান পাশে সরিয়ে রেখে এখন এই উদীয়মান জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
