ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান: নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান: নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর গড়াতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর গণভবনে নেই। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তখন গণভবনমুখী। সড়কে সড়কে মানুষের ঢল, কোথাও উল্লাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, কোথাও আবার সংঘর্ষের আশঙ্কা।

তবে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণার পর ইন্টারনেট সংযোগ ফিরতেই সর্বসাধারণেরর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। দেশ ছেড়ে পালিয়েছে শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক নতুন অধ্যায়ে। যে অধ্যায়ের সূচনা করতে দীর্ঘ অনেক বছর আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম সয়েও ব্যর্থ হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো।

জুলাই আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আন্দোলনকারীসহ অনেকের কাছে দিনটি ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে পরিচিত। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন এভাবে রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করবে, এটা সাধারণ মানুষের চিন্তায়ও ছিল না।

কিন্তু এই পরিণতি কি একদিনে এসেছে? উত্তর হলো ‘না’। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলন, বিতর্কিত নির্বাচন, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক চাপ, সীমাহীন দুর্নীতি। এসবের প্রভাব পড়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। যার ফলে ওই আন্দোলন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ নেয় নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রাম ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল, এর সূচনা রাজনৈতিক দলের হাতে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। আর শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী  বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানটা ছিল অর্গানিক অভ্যুত্থান। যেখানে আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সরকার এই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে বরং একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং আন্দোলনের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।”

২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের একটি রায় সামনে আসে। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি ছিল, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা বাতিল বা যৌক্তিক সংস্কার করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমদিকে কর্মসূচি ছিল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ। আস্তে আস্তে আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে থাকে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আন্দোলন মূলত কোটা ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনা এবং পরে প্রাণহানির খবর আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেন। অভিভাবকরা রাস্তায় নামেন। শিক্ষকরা বিবৃতি দেন। আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী—বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।

একপর্যায়ে আন্দোলনের মূল স্লোগান আর শুধু কোটা সংস্কার থাকেনি। রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং শেষমেশ আসে সরকারের পদত্যাগের দাবিও।রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ হাসিনার হঠাৎ ক্ষমতার অন্তর্ধান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় পরিবর্তনের প্রতীক ৫ আগস্ট। শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি ছিল একটি দীর্ঘদিনের ক্ষমতা কাঠামো ভাঙ্গার দিন। যেখানে পরিবর্তন, সংস্কারের দাবি ছিল মূল। এমনটি আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ইতিহাসের নতুন বাঁকে বাংলাদেশ যেখানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার স্বর্তস্ফূর্ত জানান দিয়েছে ছাত্র-জনতা। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর স্মৃতি, রক্তাক্ত রাজপথ, শোকাহত পরিবার, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ইন্টারনেটবিহীন নিস্তব্ধ শহর, আর রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয় পরিবর্তিত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার কথা।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে