নবপ্রকাশ ডেস্কঃ
চীনের সঙ্গে প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান জে–১০সিই কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।চীন তাদের বিমানবাহিনীর জন্য ব্যবহার করে থাকে জে-১০সি। বহুমাত্রিক ওই যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ হচ্ছে জে-১০সিই। গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান স্বল্পস্থায়ী সংঘাতে ওই যুদ্ধবিমানের কথা বৈশ্বিক আলোচনায় উঠে আসে। পাকিস্তান জে–১০সিইর মাধ্যমে হামলা চালিয়ে ফ্রান্সের তৈরি ভারতের একাধিক দাসল্ট রাফাল যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত চীনের তৈরি ওই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
গতকাল মঙ্গলবার তথ্য ও উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মডেলের চতুর্থ প্রজন্মের এমআরসিএ (মাল্টিপল রোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি সিস্টেম—এগুলো কেনার প্রক্রিয়া চলমান। এই অর্থবছরে বাজেট পাওয়া গেলে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে চলে যাবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে বেইজিংয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান জে–১০সিই কেনার বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তাঁদের মধ্যে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ওই সফরের সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, দুই নেতার বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদীর প্রকল্পে চীনের সহায়তা, মাল্টিপল রোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট (বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান) কেনা, বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে চীনের কুনমিংয়ের বহুমাত্রিক সংযুক্তি ইত্যাদি।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের কয়েক দিন আগে চীনের একটি প্রতিনিধিদল জে–১০সিই কেনাকাটা নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশে এসেছিল। চীনের প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় অবস্থানকালে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছিল।
কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি চীনের নির্মিত চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান জে–১০সির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। দামে সাশ্রয়ী এ যুদ্ধবিমান ইউরোপের আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু জে–১০সিই কেনার সময় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের বেশ কয়েকটি দেশের ভূরাজনৈতিক সমীকরণটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত
সরকারের সমসাময়িক কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, এমআরসিএ (জে-১০সিই) এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘সাম্প্রতিক একটা রিয়েল এক্সপেরিয়েন্স আছে কমব্যাট সিচুয়েশনে। ভারত-পাকিস্তানে যখন যুদ্ধ হচ্ছে, ভারতের রাফাল ডাউন হয়েছিল, সেটা করেছিল চায়নিজ জে-১০সি। এ তথ্য এখন প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং চায়নার তৈরি একটা মাল্টিরোল ফাইটার, এখন রাফালকে বলা হয় ৪.৫ জেনারেশনের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটারগুলোর একটা, তার সঙ্গে কমব্যাট সিচুয়েশনে খুবই ভালো করেছে। সো, বাংলাদেশ সেদিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং আশা করা যায় আমরা এই পথে খুব ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’
জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, ‘একটা কথা বলে রাখা ভালো, সিমিলার কোয়ালিটির রাফাল বলি বা ইউরো ফাইটার টাইফুন বলি, ইউরোপিয়ান ভেরিয়েন্টের তুলনায় চায়নিজ ফাইটারগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আশা করি, আমাদের সরকার জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব রকমের পদক্ষেপ নেবে।’
এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, এমআরসিএ (জে-১০সিই) এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার–সংক্রান্ত কমিটি ‘নেগোসিয়েশন বৈঠকের’ মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করেছে। সেটা অনুমোদনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদ ও বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য ওয়ার জোনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের তৈরি জে-১০সি ‘ভিগোরাস ড্রাগন’ চতুর্থ প্রজন্মের বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান বা এমআরসিএ। সুপারসনিক গতির এ যুদ্ধবিমান একই সঙ্গে আকাশযুদ্ধ, স্থল ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, নজরদারি এবং শত্রুর রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত হানতে সক্ষম। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা রয়েছে। অন্যান্য যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের সঙ্গে সমন্বিতভাবেও অভিযান চালাতে পারে জে-১০সি।
প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, তুলনামূলক সাশ্রয়ী ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি জে-১০সির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও পশ্চিমা সমমানের যুদ্ধবিমানের চেয়ে কম হতে পারে।
