ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » কোরবানির চামড়া নিয়ে আশা-শঙ্কার ঈদ: সরকারি দাম বাড়লেও মাঠে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মূল্য

কোরবানির চামড়া নিয়ে আশা-শঙ্কার ঈদ: সরকারি দাম বাড়লেও মাঠে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মূল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে কোরবানির পশুর চামড়া দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা আলোচনা, প্রত্যাশা ও হতাশা। সরকার চামড়ার দাম বৃদ্ধি, বিনামূল্যে লবণ বিতরণ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই সুফল পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

চলতি বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়ার নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা চামড়া খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছিল।

সরকারি হিসাবে নির্ধারিত দরে বিক্রি হলে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার মূল্য এক হাজার টাকারও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক এলাকায় চামড়ার দাম আরও কম পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার বাজার ছিল সবচেয়ে হতাশাজনক। কোথাও কোথাও মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে।

মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্যানারি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণে কাঁচা চামড়ার বাজারে প্রত্যাশিত গতি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে লবণ, পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয়ের বৃদ্ধি চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না।

তবে চামড়া নষ্ট হওয়া এবং অপচয় রোধে এ বছর সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সরকারি অর্থায়নে বিপুল পরিমাণ লবণ সংগ্রহ করে সারা দেশে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই লবণ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের এতিমখানা, মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য কোরবানির পশুর চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠান চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে তাদের বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু চামড়ার কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে। ফলে সরকার ঘোষিত মূল্য বাস্তবায়নে আরও কঠোর নজরদারি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।

চামড়া খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, কেবল মূল্য নির্ধারণ করেই এ খাতের দীর্ঘদিনের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। সাভার ট্যানারি শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে বের করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর মাধ্যমে পুরো শিল্পখাতকে পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে চামড়া শিল্প এখনও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে এ শিল্প আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে একদিকে যেমন কোরবানিদাতারা তাদের চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাবেন, অন্যদিকে এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদে চামড়া নিয়ে আশা ও শঙ্কা পাশাপাশি অবস্থান করেছে। সরকারি উদ্যোগে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও মাঠপর্যায়ে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, কার্যকর বাজার তদারকি, শিল্পখাতের সংস্কার এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ সফল হলে দেশের চামড়া শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোরবানির চামড়া আর অবমূল্যায়নের শিকার হবে না।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে