ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » সীমান্তে চোরাচালানের মহোৎসব: ঢুকছে গরু, মাদক ও অস্ত্র; ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

সীমান্তে চোরাচালানের মহোৎসব: ঢুকছে গরু, মাদক ও অস্ত্র; ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

সীমান্তে চোরাচালানের মহোৎসব: ঢুকছে গরু, মাদক ও অস্ত্র; ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঝিনাইদহ: আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে (কোরবানির ঈদ) সামনে রেখে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ভারতীয় গরু চোরাচালানের উপদ্রব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দিন গড়িয়ে রাত নামলেই কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে এ দেশে ঢুকছে ভারতীয় গরুর বড় বড় চালান। সীমান্তের বিভিন্ন দুর্গম রুট ব্যবহার করে আনা এসব গরু নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে। তবে শুধু গরু নয়, একই রুট ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করছে মারাত্মক সব মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু চোরাই মাল ও চুনোপুঁটি আটক হলেও চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সক্রিয় ৭টি রুট ও শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট

স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মহেশপুর উপজেলার লড়াইঘাট, বাঘাডাঙ্গা, পলিয়ানপুর, মাটিলা, রাজাপুর, কুসুমপুর ও বেনীপুর সীমান্ত এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট। গভীর রাতে সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট ব্যবহার করে দেদারসে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কিছু অসাধু সদস্যের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই অবৈধ পারাপার চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের নদীয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রথমে গরু সংগ্রহ করা হয়। এরপর মহেশপুর সীমান্তের লড়াইঘাট ও হাড়িঘাটা সংলগ্ন পয়েন্ট দিয়ে সেগুলো বাংলাদেশে পুশ করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, ভারতের নদীয়া জেলার পান্ডুয়া বাজার থেকে সবচেয়ে বেশি গরু আসছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর এসব গরু কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গার শিয়ালমারি হাটসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় পশুর হাটে সরবরাহ করা হচ্ছে।

মাদক ও অস্ত্রের উদ্বেগজনক অনুপ্রবেশ

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারতে বর্তমানে গরুর চাহিদা কম থাকায় এবং বাংলাদেশে কোরবানির মৌসুম হওয়ায় পাচারের প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। গরুর চালানের আড়ালে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ভারতীয় মদের মতো মারাত্মক সব মাদকের চালানও ঢুকছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মহেশপুর সীমান্তে মাদক জব্দের ঘটনায় মোট ৪৫টি মামলা হয়েছে। এই ১৭ মাসে উদ্ধারকৃত মাদকের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:-

ফেনসিডিল— ২১,৬১৩ বোতল

ভারতীয় মদ— ১৪,২২২ বোতল

গাঁজা— ১৬৭.৮৫৩ কেজি

ইয়াবা ট্যাবলেট— ৮৮,৪১৩ পিস

মোট আনুমানিক মূল্য—১০ কোটি ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৬ টাকা

শুধু মাদকই নয়, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা স্থানীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা গ্রামে একটি খড়ের গাদা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে বিজিবি।

এছাড়া মাটিলা বিওপি (Border Outpost) এলাকা থেকেও বিদেশি পিস্তল, ওয়ানশুটার গান ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের (২০৬) জানুয়ারি মাসেও সীমান্ত এলাকা থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অস্ত্র উদ্ধারের এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি।

আইনি দুর্বলতার সুযোগ: স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যদের পরিচয় সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের নখদর্পণে থাকলেও অদৃশ্য কারণে মূল হোতারা আইনের আওতার বাইরেই থেকে যায়। অনেক সময় বাহক বা চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও দুর্বল মামলার কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় একই অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ে।

চরম ক্ষতির মুখে দেশীয় খামারিরা

চোরাই পথে কম দামে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঝিনাইদহ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের স্থানীয় খামারিরা। তাদের অভিযোগ, কোরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে তারা ধারদেনা ও চড়া মূল্যে গোখাদ্য কিনে যে গরু লালন-পালন করেছেন, ভারতীয় গরুর আকস্মিক অনুপ্রবেশে তার ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশীয় গরুর বাজারে ধস নামায় ঝিনাইদহ অঞ্চলের হাজার হাজার খামারি এখন চরম আর্থিক লোকসান ও মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছেন।

বিজিবির বক্তব্য ও জনমনে প্রশ্ন

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম বলেন:

“সীমান্ত দিয়ে মাদক, গরু, জাল নোট ও যেকোনো ধরনের চোরাচালান রোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি আমরা সীমান্তবর্তী সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভাও পরিচালনা করছি।”

বিজিবির তৎপরতায় বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাই মাল জব্দ হওয়ার বিষয়টি প্রশংসনীয় হলেও স্থানীয় সচেতন মহলে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দিনের পর দিন এই সিন্ডিকেট সচল থাকে এবং মূল গডফাদাররা কেন বারবার আইনের জাল কেটে অধরাই থেকে যায়? সীমান্ত সুরক্ষায় আরও কঠোর ও সমন্বিত অভিযান না চালালে এই চোরাচালান ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশ রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে