ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » শরতের আগমনী ভেলা ও সাদা মেঘের সঙ্গে কাশফুলের খেলা

শরতের আগমনী ভেলা ও সাদা মেঘের সঙ্গে কাশফুলের খেলা

আশিকুর রহমান

বর্ষার শেষ বিকেলগুলো যখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, আকাশের গায়ে জমে থাকা কালো মেঘের ভার কমতে থাকে, তখন দূর দিগন্তে দেখা দেয় এক টুকরো নীল। সেই নীলের বুক চিরে ভেসে যায় তুলোর মতো সাদা মেঘ। বাতাসে মিশে যায় অচেনা এক স্নিগ্ধতা। আর নদীর পাড়, বিলের ধারে কিংবা জনপদের প্রান্তিক জমিতে হঠাৎ করেই মাথা তুলে দাঁড়ায় শুভ্র কাশফুল।
প্রকৃতি তখন আস্তে আস্তে শরৎের নীরব আগমণীর বার্তার সুর শুনায় আমাদের মাঝে।

শরতের আগমন যেন কোনো কোলাহলময় উৎসব নয়। নেই ঢাকঢোল, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তবু প্রকৃতির প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি বাতাসে, আকাশের প্রতিটি মেঘে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বর্ষার ভেজা আবেশ পেরিয়ে শরৎ আসে একরাশ আলো, নীলিমা আর শুভ্রতা নিয়ে। আর সেই শুভ্রতার সবচেয়ে চেনা নাম—কাশফুল। কাশফুল আর শরৎ যেন একই কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি। একটিকে বাদ দিলে অন্যটির সৌন্দর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নীল আকাশের নিচে সাদা মেঘের ভেলা, তার ঠিক নিচেই বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের সারি—বাংলার প্রকৃতির এই দৃশ্যের কাছে কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জাই যেন ম্লান। কাশবনের ভেতর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন অসংখ্য কাশফুল একসঙ্গে দুলে ওঠে। দূর থেকে মনে হয়, সবুজ মাঠের বুকের ওপর সাদা ঢেউ উঠেছে। কখনো সেই ঢেউ মৃদু, কখনো একটু চঞ্চল। সূর্যের আলোয় কাশের শীষে যখন রুপালি ঝিলিক পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই যেন সাদা মুক্তোর মালা পরে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশও তখন চুপ করে থাকে না। নীল আকাশের বিশাল ক্যানভাসে সাদা মেঘেরা নিজেদের মতো করে ছবি আঁকে। কখনো মেঘের দল ভেসে যায় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, কখনো তারা থমকে দাঁড়ায়। নিচের কাশফুলও যেন তাদের দেখে মাথা দোলায়। আকাশের মেঘ আর মাটির কাশ—দূরত্ব অনেক, অথচ সৌন্দর্যের ভাষা এক। একজন আকাশে ভাসে, অন্যজন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। একজনের ঠিকানা নীলিমা, অন্যজনের সবুজ মাঠ। তবু দুজনের পোশাকই শুভ্র। এ যেন শরতের নিজস্ব প্রেমকথা। কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, দূরের তালগাছ, বিকেলের রোদ আর কাশবনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলা—এসব দৃশ্য অনেকের শৈশবকে আজও ফিরিয়ে নেয়।
শহরের কংক্রিটের দেয়ালের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মের কাছেও কাশফুলের আলাদা এক আকর্ষণ। শরৎ এলেই অনেকের মনে পড়ে যায় গ্রামের বাড়ির কথা। মনে পড়ে যায় সেই পথ, যে পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ত বিস্তীর্ণ কাশবন। মনে পড়ে যায় বিকেলের সেই আলো, যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ত আর কাশফুলের শুভ্রতা হয়ে উঠত আরও উজ্জ্বল। কিছু স্মৃতি আসলেই কখনোই পুরোনো হয় না।
ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরীতে শরৎকে অনুভব করার সুযোগ সীমিত। চারপাশে কংক্রিট, উঁচু ভবন, যানবাহনের শব্দ আর মানুষের ছুটে চলা। তবু শরৎ তার অস্তিত্ব জানান দিতে ভুলে না। কখনো ভোরের নরম আলোয়, কখনো বিকেলের মেঘলা আকাশে, কখনো হঠাৎ বয়ে যাওয়া কোমল বাতাসে। আর শহরের একটু বাইরে গেলেই দেখা মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত কাশফুলের। কাশবনের সামনে দাঁড়ালে শহুরে ব্যস্ততা যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ উঠে যায় আকাশের দিকে। মানুষ তখন ছবি তুলতে যায় ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় ছবির চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে ফেরে—একটু প্রশান্তি, কিছুটা নস্টালজিয়া আর প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি।শরতের সঙ্গে বাঙালির উৎসবেরও গভীর সম্পর্ক। শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘ ভাসে আর বাতাসে কাশফুল দোলে, তখন প্রকৃতির ভেতরেই যেন উৎসবের পূর্বাভাস তৈরি হয়। কাশফুলের শুভ্রতা মনে করিয়ে দেয় পবিত্রতার কথা। তার দোলায় থাকে আনন্দের বার্তা। শরতের নির্মল আকাশে যেন নতুন দিনের আহ্বান। তাই কাশফুলকে ঘিরে মানুষের এত আবেগ। একটি ফুল, অথচ কত গল্প তার!
তবে শরতের এই চিরচেনা দৃশ্যও আজ অনেক জায়গায় সংকটে। নদীর তীর দখল, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিভিন্ন মানবীয় কর্মকাণ্ডে হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা। সঙ্গে হারাচ্ছে কাশবনের বিস্তৃতিও।
একদিন যে মাঠের প্রান্তজুড়ে কাশফুল দুলত, সেখানে হয়তো আজ দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন। যে নদীর পাড়ে শরতের বাতাসে কাশফুলের শীষ নেচে উঠত, সেখানে হয়তো জমেছে বর্জ্য কিংবা গড়ে উঠেছে স্থাপনা।
প্রকৃতি তার সৌন্দর্য দিয়ে আমাদের প্রতি বছর ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্বও মানুষের। কারণ কাশফুল হারিয়ে গেলে শুধু একটি উদ্ভিদ হারাবে না; হারাবে শরতের একটি চেনা দৃশ্য, হারাবে শৈশবের একটি স্মৃতি, হারাবে বাংলার প্রকৃতির একটি স্বতন্ত্র রূপ। ঋতু বদলায়। বর্ষা যায়, শরৎ আসে। শরতের পর আসে হেমন্ত। সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে। কিন্তু কিছু দৃশ্য মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা তেমনই একটি দৃশ্য। আর তার নিচে বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল যেন সেই দৃশ্যের পূর্ণচ্ছেদ। শরৎ আসলে প্রকৃতি খুব বেশি কিছু চায় না। শুধু একটু নীল আকাশ, কিছু সাদা মেঘ আর মাঠের ধারে একগুচ্ছ কাশফুল নিয়েই সে হয়ে ওঠে অপরূপ। দিগন্তের দিকে তাকালে তখন মনে হয়—আকাশ আর মাটি যেন পাশাপাশি বসে কোনো অদৃশ্য কবিতা লিখছে। মেঘ তার শব্দ, কাশফুল তার ছন্দ, আর শরৎ সেই কবিতার নাম। শরৎ তাই শুধু একটি ঋতু নয়; শরৎ একটি অনুভূতি। যে অনুভূতিতে বর্ষার বিদায়ের বিষণ্নতা আছে, আছে নতুন দিনের নির্মল আনন্দ। আছে শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের পথের ডাক, নদীর পাড়ের বাতাস। আছে আকাশভরা নীল আর মাটিজোড়া শুভ্রতা।
আর আছে কাশফুলের সেই চিরন্তন খেলা—
সাদা মেঘের সঙ্গে সাদা কাশফুলের।
এই খেলাই বাংলার শরৎকে করে তোলে অনন্য। প্রতি বছর শরৎ আসে, কাশফুল দোলে, মেঘ ভাসে। আর প্রকৃতি নীরবে বলে যায়—
“ফিরে এসো, একটু থামো।
দেখো, পৃথিবী এখনো সুন্দর।”

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে