ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » বিশ্বকাপের ফুটবল বানানো দেশটিই কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি!

বিশ্বকাপের ফুটবল বানানো দেশটিই কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি!

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা আর স্বপ্নের মঞ্চ। বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা যখন মাঠে নামেন, তখন সবার চোখ থাকে খেলোয়াড়, কোচ কিংবা ট্রফির দিকে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, বিশ্বকাপের ম্যাচে ব্যবহৃত ফুটবলের পেছনে রয়েছে এমন একটি দেশের শ্রম, দক্ষতা ও ঐতিহ্য—যে দেশটি নিজেই কখনো ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। সেই দেশটির নাম পাকিস্তান।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে পাকিস্তানের কোনো দল না থাকলেও, তাদের তৈরি বলই বিশ্বকাপের মাঠে গড়িয়েছে দশকের পর দশক। বিশেষ করে পাকিস্তানের শিল্পনগরী Sialkot আজ বিশ্ব ফুটবল উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হ্যান্ড-সেলাই করা ফুটবল এই শহরেই তৈরি হয়। প্রতি বছর এখানকার কারখানাগুলো থেকে কয়েক কোটি ফুটবল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

ফুটবল তৈরির সঙ্গে সিয়ালকোটের সম্পর্ক এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় কারিগররা প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত ফুটবল মেরামতের কাজ শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে তারা নিজস্বভাবে বল তৈরি করতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র শিল্পই পরিণত হয় বিশ্বমানের উৎপাদন ব্যবস্থায়।

বর্তমানে বিশ্বের বিখ্যাত ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ফুটবল তৈরি করে সিয়ালকোটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা, রিবকসহ বহু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের উৎপাদনের বড় অংশ পাকিস্তানের এই শহরের ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরি করা অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। ফিফার কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। পাকিস্তানের সিয়ালকোটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফরওয়ার্ড স্পোর্টস টানা একাধিক বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের “ব্রাজুকা”, ২০১৮ সালের “টেলস্টার১৮”, ২০২২ সালের “আল রিহলা” এবং ২০২৬ সালের “ট্রিয়ন্ডা”—সবগুলোর উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল সিয়ালকোটের এই প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিসিয়াল বল “Trionda”ও পাকিস্তানেই তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত এই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে ব্যবহৃত বল সিয়ালকোটের কারখানায় উৎপাদিত হয়েছে।

একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, পাকিস্তান কখনোই ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। অথচ ১৯৮২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে ব্যবহৃত অসংখ্য বল পাকিস্তানে তৈরি হয়েছে। ফলে বলা যায়, পাকিস্তানের জাতীয় দল মাঠে না থাকলেও তাদের তৈরি বল প্রতিটি ম্যাচে উপস্থিত থেকেছে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ। একটি দেশ আন্তর্জাতিক ফুটবলে তেমন সফল না হলেও উৎপাদন দক্ষতা ও কারিগরি উৎকর্ষের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সিয়ালকোটের ফুটবল শিল্পে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। একটি মানসম্মত ফুটবল তৈরিতে শত শত সেলাই এবং বহু ধাপের মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এখনও উৎপাদিত ফুটবলের বড় অংশ হাতে সেলাই করা হয়, যা বলের স্থায়িত্ব ও মান নিশ্চিত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিয়ালকোটের কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাই এই শিল্পকে বিশ্বব্যাপী আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলেও মানবশ্রম ও কারিগরি দক্ষতার বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি।

ফুটবল শিল্প পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস। সিয়ালকোট থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলারের ক্রীড়াসামগ্রী রপ্তানি হয়। শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট সরঞ্জাম, হকি স্টিক, বক্সিং গ্লাভস এবং সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি উৎপাদনেও শহরটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাকিস্তানের কোনো দল নেই, নেই কোনো বিশ্বকাপ জয়ের গল্পও। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রতিটি গোল, প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্মরণীয় মুহূর্তের কেন্দ্রে থাকা ফুটবলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানের সিয়ালকোটের হাজারো শ্রমিকের ঘাম ও দক্ষতা। তাই বলা যায়, বিশ্বকাপের মঞ্চে পাকিস্তান কখনো খেলোয়াড় হিসেবে না থাকলেও, তাদের তৈরি বলের মাধ্যমে দেশটি বহুদিন ধরেই বিশ্ব ফুটবলের নীরব অথচ অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে।

 

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে