লা লিগায় গতকাল এলচেকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে লা লিগায় দুর্দান্ত সূচনা করেছে বার্সেলোনা। কাতালান ক্লাবটির কোচ হান্সি ফ্লিক প্রমাণ করে দিয়েছেন, দলে প্রথাগত কোনো স্ট্রাইকার না থাকা মানেই কোনো সংকট নয়; বরং সঠিক উপায়ে ব্যবহার করলে এটি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে বাড়তি গতি এবং বৈচিত্র্য আনতে একটি মারাত্মক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
ফ্লিকের নিখুঁত কৌশল
গতানুগতিক কোনো স্ট্রাইকারকে সেন্ট্রাল পজিশনে না খেলিয়ে নিজের আক্রমণাত্মক দর্শনেই অনড় ছিলেন ফ্লিক। রাফিনিয়াকে সামনে রেখে এবং পুরো ফরোয়ার্ড লাইনকে সবসময় গতিশীল রেখে পজিশন বদল ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গাগুলো দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এলচের বিপক্ষে এই কৌশলটি নিখুঁতভাবে কাজ করেছে।
অন্যদিকে, এলচেও ফ্লিকের এই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের ফাঁদে পা দেয়। তারা সাহসিকতার সঙ্গে নিচ থেকে বল প্লে করার চেষ্টা করে এবং তাদের রক্ষণরেখাকে বেশ ওপরে তুলে আনে, যা বার্সেলোনাকে কাঙ্ক্ষিত স্পেস বা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতে সবচেয়ে বড় সহায়তা করে।
প্রথম গোল: দারুণ হাই প্রেসিং
ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে দুর্দান্ত হাই প্রেসিংয়ের সুবাদে। প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগে বল কেড়ে নেন জাভি এসপার্ট। মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় দৌড় শুরু করেন রাফিনিয়া, আর ফার্মিন লোপেজ নিখুঁত এক পাস বাড়িয়ে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে গোলকিপারের সামনে একা পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেন।
দ্বিতীয় গোল: মাত্র দুই পাসেই বাজিমাত
লিড নেওয়ার পরেও বার্সেলোনার খেলার গতি একটুও কমেনি। বল পায়ে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা এলচের ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গা খুঁজতে থাকে। এর প্রমাণ মেলে দ্বিতীয় গোলে। রাফিনিয়া ও করিম আদিয়েমির চাপে পড়ে বার্নাল বল পুনরুদ্ধার করেন। এরপর বার্সেলোনার মাত্র দুটি পাস—প্রথমে লামিনে ইয়ামাল এবং পরে রাফিনিয়ার বাড়ানো বল ধরে গোলকিপারকে একা পেয়ে নিখুঁত শটে গোল করেন আদিয়েমি।
তৃতীয় গোল: একই স্ক্রিপ্টের পুনরাবৃত্তি
তৃতীয় গোলের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা যায়। এলচের অর্ধ থেকে বল ছিনিয়ে নেন দানি ওলমো এবং সেটি বাড়িয়ে দেন অ্যান্থনি গর্ডনকে। সঙ্গে সঙ্গেই ফার্মিন ও রাফিনিয়া প্রতিপক্ষের ফাঁকা জায়গায় ছুটে যান, যার শেষ পরিণতি হিসেবে আসে রাফিনিয়ার আরেকটি দুর্দান্ত গোল।
অ্যান্তনি গর্ডন কেবল অ্যাটাকিং থার্ডে ঘুরে বেড়ানোতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁকা জায়গাগুলো দারুণভাবে পড়তে পেরেছিলেন। এর নিখুঁত প্রমাণ মেলে দলের চতুর্থ গোলে। প্রতিপক্ষের অর্ধ থেকে ফার্মিন লোপেজ বল ইন্টারসেপ্ট করার পর গর্ডন দ্রুত ডিফেন্ডারের পেছনে দৌড় শুরু করেন এবং পেদ্রির নিখুঁত পাস থেকে বল জালে জড়ান।
পঞ্চম গোল এবং সার্বিক কৌশল
পঞ্চম গোলটি প্রমাণ করে যে বার্সেলোনা কেবল দ্রুত কাউন্টার-অ্যাটাকের ওপরই নির্ভরশীল নয়। পেদ্রির বল পুনরুদ্ধারের পর পুরো দল মিলিয়ে ১৬টি পাস খেলে, যার শেষ প্রান্তে জাভি এসপার্টের বাড়ানো বল থেকে ফার্মিন লোপেজ সহজে ঘুরিয়ে বল জালে পাঠান।
এলচের বিপক্ষে এই পাঁচ গোলের জয় হান্সি ফ্লিকের প্রকল্পের একটি বড় দিক উন্মোচন করেছে। প্রমাণিত হয়েছে, আক্রমণভাগের ধার বজায় রাখতে বার্সেলোনার সবসময় প্রথাগত কোনো স্ট্রাইকারের প্রয়োজন নেই।
ফ্লিকের কৌশলগত মূল বিষয়গুলো হলো, প্রথমত খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক পজিশন বদল ও নড়াচড়া প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। এরপর প্রতিপক্ষের মাঠে বল পুনরুদ্ধার করে দ্রুত আক্রমণ সাজানো। একাধিক পজিশনে খেলতে সক্ষম খেলোয়াড়রা আক্রমণভাগকে করে তোলে আরও গতিশীল ও অনির্দেশ্য।
মৌসুম সবে শুরু হলেও এলচের বিপক্ষে এই বড় জয়টি পরিষ্কার বার্তা দেয়, হান্সি ফ্লিক প্রচলিত কোনো সেন্টার-ফরোয়ার্ডের অভাবে ক্লাবের মৌলিক পরিচয় বদল করতে চান না। বরং জার্মান মাস্টারমাইন্ড আক্রমণাত্মক ফুটবল, হাই প্রেসিং এবং স্পেস এক্সপ্লোয়েশনের নিজস্ব দর্শনকেই আরও নিখুঁত করে তুলতে চান।
