নবপ্রকাশ ডেস্ক:
হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে এবং সরাসরি ধাওয়া করে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় একটি মাদক আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। গতকাল শনিবার বিকেলে গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। প্রতিমন্ত্রী নিজেই তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই অভিযানের একটি ভিডিও আপলোড করলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এবং আইনি বিতর্ক শুরু হয়।
অভিযানের দৃশ্য ও ভিডিও প্রকাশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’ শীর্ষক ভিডিওটিতে দেখা যায়, কালো রঙের একটি গাড়ি থেকে নেমে হাতে অস্ত্র নিয়ে ‘এই ধর ধর ধর’ বলে চিৎকার করে ছুটছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরাও কয়েকজনকে ধাওয়া করেন এবং একপর্যায়ে একজনকে লাথি মারতেও দেখা যায়। এ সময় প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ করা দেহরক্ষীসহ সরকারি দেহরক্ষীদেরও অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে দেখা যায়।
পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে সেখান থেকে সন্দেহভাজন ছয় ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির জানান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন নিজে ফোন করে ছয়জনকে আটকের বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাদা পাউডারজাতীয় কিছু পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছে, যা হেরোইন কি না তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আইনগত বিতর্ক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে সরাসরি অস্ত্র হাতে মাঠে নেমে অভিযান পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা নির্বাহী বিভাগের নীতিনির্ধারক; মাঠপর্যায়ে সরাসরি পুলিশি অভিযান পরিচালনা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা’ অনুযায়ী, লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার জন্যই বহন করা যায়। কোনো অবস্থাতেই তা উঁচিয়ে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রদর্শনীবাজি বা আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
উচ্চ আদালতের আইনজীবী তাওহীদুল ইসলাম জানান, অস্ত্র আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেছেন, মন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার কথা। আত্মরক্ষা ছাড়া এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন না করাই সমীচীন।
প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও সাফাই
অস্ত্রের বৈধতা ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর লাইসেন্স নিয়ে সংগ্রহ করেছেন। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা প্রার্থীর হলফনামায় এই অস্ত্র থাকার কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ে এলাকাবাসী বারবার তাঁর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। পুলিশকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি নিজে সেখানে গিয়েছেন। ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং এর সঙ্গে কোনো দলের নেতাকর্মী জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
